ইসলাম ধর্মে কোরবানির ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মানবজাতির শুরু থেকেই আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করার রীতি চালু ছিল। তবে বর্তমান মুসলিম সমাজে যে ঈদুল আযহার কোরবানি প্রচলিত, তার সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে নবী ইব্রাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর ঘটনা।
ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহর নির্দেশে নবী ইব্রাহিম (আ.) তার প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু তার আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি পশু কোরবানি করার ব্যবস্থা করে দেন। সেই স্মৃতিকে ধারণ করেই প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ মুসলমানরা ঈদুল আযহা উদযাপন করেন।
ঈদুল আযহার সূচনা
ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর মুসলমানদের জন্য দুটি বড় ধর্মীয় উৎসব চালু হয়— ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা।
হিজরি দ্বিতীয় সালে প্রথমবারের মতো ঈদুল আযহা পালিত হয়। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে কোরবানির নির্দেশ পাওয়ার পর ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজ হাতে পশু কোরবানি করেন।
প্রথম কোরবানিতে কোন পশু বেছে নিয়েছিলেন নবী (সা.)?
বিভিন্ন বিশুদ্ধ হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, ইসলামের নবী প্রথম কোরবানিতে দু’টি শিংওয়ালা সাদা-কালো রঙের দুম্বা কোরবানি করেছিলেন।
সহিহ বুখারির একটি হাদিসে সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেছেন:
“রাসূলুল্লাহ (সা.) দু’টি সাদা-কালো শিংওয়ালা দুম্বা নিজ হাতে জবাই করেন।”
মিশকাত শরিফেও একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ আছে, নবী (সা.) মোটাসোটা ও সুস্থ দুম্বা বেছে নিয়েছিলেন এবং “আল্লাহু আকবার” বলে নিজ হাতে সেগুলো জবাই করেন।
ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, একটি দুম্বা তিনি নিজের পক্ষ থেকে এবং আরেকটি নিজের উম্মতের পক্ষ থেকে কোরবানি করেছিলেন।
কেন দুম্বা বেছে নেওয়া হয়েছিল?
গবেষকদের মতে, নবী মুহাম্মদ (সা.) সবসময় কোরবানির জন্য সুস্থ, সুন্দর, পরিণত বয়সের ও ত্রুটিমুক্ত পশু নির্বাচন করতেন। দুম্বা, ভেড়া বা মেষের ক্ষেত্রে সাধারণত খাসি করা পশুকেই অগ্রাধিকার দিতেন।
দুম্বা আরব অঞ্চলে পরিচিত ও মূল্যবান পশু ছিল। এছাড়া এটি নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর কোরবানির ঐতিহাসিক স্মৃতির সঙ্গেও প্রতীকীভাবে যুক্ত বলে মনে করেন অনেকে।
পরে আর কোন পশু কোরবানি করেছিলেন?
দুম্বার পাশাপাশি ইসলামের নবী বিভিন্ন সময় উট, গরু ও ভেড়াও কোরবানি করেছেন বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।
বিশেষ করে:
- হুদাইবিয়ার সময় তিনি উট কোরবানি করেছিলেন।
- বিদায় হজে তিনি মোট ১০০টি উট কোরবানি দেন।
- এর মধ্যে ৬৩টি উট নিজ হাতে জবাই করেছিলেন বলে ইসলামি ইতিহাসে উল্লেখ আছে। বাকিগুলো জবাই করেন হযরত আলী (রা.)।
কোরবানির মূল শিক্ষা কী?
ইসলামে কোরবানির মূল উদ্দেশ্য শুধু পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, ত্যাগ এবং তাকওয়া প্রকাশ করা।
কুরআনে বলা হয়েছে:
“আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।”
এই কারণেই ঈদুল আযহা মুসলমানদের কাছে শুধু উৎসব নয়, আত্মত্যাগ ও বিশ্বাসেরও একটি বড় প্রতীক।

