প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই ভুলে যান মানুষ। তার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ একটি ঘটনা হলো বন্ধু, আত্মীয় বা সহকর্মীর জন্মদিন ভুলে যাওয়া। পরে মনে পড়লে শুভেচ্ছা জানাতে দেরি হয়ে যায়, অনেক সময় সম্পর্কেও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই সমস্যার সমাধানেই নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে বিশ্বের জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ।
মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা তাদের মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে এমন একটি নতুন ফিচার পরীক্ষা করছে, যা ব্যবহারকারীকে বন্ধুর জন্মদিনের কথা আগেভাগেই মনে করিয়ে দেবে। বর্তমানে এই সুবিধাটি বিটা সংস্করণে সীমিত আকারে চালু হয়েছে এবং সব দেশের ব্যবহারকারীরা এখনও এটি পাচ্ছেন না।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই ফিচারটি ভবিষ্যতে সামাজিক যোগাযোগকে আরও সহজ ও ব্যক্তিগত করে তুলতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি তথ্যের গোপনীয়তা এবং বিভিন্ন দেশের আইন সম্পর্কেও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
নতুন ফিচারের মাধ্যমে কোনো বন্ধুর জন্মদিন এলে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারী একটি নোটিফিকেশন পাবেন। সেই বার্তা দেখেই তিনি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শুভেচ্ছা পাঠাতে পারবেন।
এতে আর আলাদা করে ক্যালেন্ডারে তারিখ লিখে রাখা বা অন্য অ্যাপের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন হবে না। যাঁরা নিয়মিত অনেক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, তাঁদের জন্য এটি বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।
অনেকের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে, হোয়াটসঅ্যাপ তো অ্যাকাউন্ট খোলার সময় জন্মতারিখ জানতে চায় না। তাহলে অ্যাপটি জন্মদিনের তথ্য কোথা থেকে পাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে বিভিন্ন দেশের নীতিমালার মধ্যে।
বর্তমানে বিশ্বের সব দেশে হোয়াটসঅ্যাপের নিবন্ধন প্রক্রিয়া এক রকম নয়। কিছু দেশে ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাইয়ের জন্য জন্মতারিখ দিতে হয়। সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।
ফলে যেসব দেশে এই তথ্য আগে থেকেই হোয়াটসঅ্যাপের কাছে রয়েছে, সেসব দেশেই প্রথমে জন্মদিনের নোটিফিকেশন ফিচার চালু করা হয়েছে।
বর্তমানে এই ফিচারটি কেবল বিটা সংস্করণের নির্দিষ্ট কিছু ব্যবহারকারীর জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া সব দেশে একই ধরনের আইন কার্যকর না থাকায় ফিচারটি একসঙ্গে সবার জন্য চালু করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম রয়েছে। বয়স যাচাইয়ের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই জন্মতারিখ বাধ্যতামূলকভাবে সংগ্রহ করা হয়।
এই কারণে ওই দেশগুলোর ব্যবহারকারীদের জন্য জন্মদিনের রিমাইন্ডার চালু করা তুলনামূলক সহজ হয়েছে।
ভারতে বর্তমানে হোয়াটসঅ্যাপে নিবন্ধনের জন্য শুধু মোবাইল নম্বর এবং ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) প্রয়োজন হয়।
ব্যবহারকারীর জন্মতারিখ সংগ্রহ করা হয় না। ফলে কার জন্মদিন কবে, সেই তথ্য হোয়াটসঅ্যাপের কাছে থাকে না।
এই কারণেই আপাতত ভারতের ব্যবহারকারীরা জন্মদিনের নোটিফিকেশন সুবিধা পাচ্ছেন না।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে যদি অ্যাপ নিবন্ধনের নিয়ম পরিবর্তন না হয়, তাহলে শুধুমাত্র এই ফিচারের জন্য আলাদা জন্মতারিখ সংগ্রহ করাও সহজ হবে না।
জন্মদিনের মতো ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করলে স্বাভাবিকভাবেই গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের উচিত ব্যবহারকারীর স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার না করা।
যদি ভবিষ্যতে আরও দেশে এই ফিচার চালু করা হয়, তাহলে ব্যবহারকারীদের তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে—সেই বিষয়েও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রয়োজন।
অনেকেই ভাবেন, নতুন ফিচার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সেটি সবার ফোনে চলে আসে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।
প্রথমে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত সংখ্যক ব্যবহারকারীর মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে নতুন ফিচার চালু করে। এটিই বিটা সংস্করণ নামে পরিচিত।
এই পর্যায়ে ব্যবহারকারীদের মতামত, ত্রুটি এবং নিরাপত্তা বিষয়গুলো যাচাই করা হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে পরে ধাপে ধাপে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য ফিচারটি উন্মুক্ত করা হয়।
হোয়াটসঅ্যাপ সম্প্রতি আরও বেশ কয়েকটি নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।
এর মধ্যে অন্যতম হলো ফোন নম্বর প্রকাশ না করেও শুধু ইউজারনেম ব্যবহার করে বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থা।
এই ফিচার চালু হলে ব্যবহারকারীরা নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর শেয়ার না করেই অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে নিরাপত্তা ও প্রতারণার ঝুঁকি বিবেচনায় কিছু দেশে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে।
নতুন জন্মদিন রিমাইন্ডার চালু হলে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ দিন ভুলে যাওয়ার সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন।
এর মাধ্যমে—
- বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের জন্মদিন সময়মতো মনে থাকবে।
- শুভেচ্ছা জানাতে দেরি হওয়ার সম্ভাবনা কমবে।
- আলাদা ক্যালেন্ডার বা রিমাইন্ডার অ্যাপ ব্যবহার করার প্রয়োজন কমে যাবে।
- ব্যক্তিগত সম্পর্ক আরও সহজে বজায় রাখা সম্ভব হবে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যুক্ত হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে হোয়াটসঅ্যাপ আরও স্মার্ট ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করতে পারে।
শুধু জন্মদিন নয়, বিবাহবার্ষিকী, গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, বিশেষ অনুষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত স্মরণীয় দিন সম্পর্কেও ব্যবহারকারীকে মনে করিয়ে দেওয়ার মতো সুবিধা ভবিষ্যতে যুক্ত হতে পারে।
হোয়াটসঅ্যাপের নতুন জন্মদিন রিমাইন্ডার ফিচার এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও এটি ব্যবহারকারীদের জন্য বেশ কার্যকর একটি সংযোজন হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা ব্যস্ততার কারণে প্রিয়জনের গুরুত্বপূর্ণ দিন ভুলে যান, তাঁদের জন্য এই সুবিধা অনেকটাই স্বস্তির।
তবে আপাতত এই ফিচার সবার জন্য উন্মুক্ত হয়নি। বিভিন্ন দেশের আইন, তথ্য সংগ্রহের নীতি এবং গোপনীয়তার বিষয় বিবেচনা করে ধাপে ধাপে এটি চালু করা হতে পারে। তাই ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদেরও এই সুবিধা পেতে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।

