খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

বিদ্যুত চুক্তি বাতিল হচ্ছেনা,দাম কমাতে চলছে আলোচনা: জ্বালানিমন্ত্রী

বিগত সরকারের সময় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি এখনই বাতিল করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে সরকার। কারণ এসব চুক্তির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে...
Homeঅর্থ-বানিজ্যব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন না, তবুও ব্যাংকে তারল্য সংকট কেন?

ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন না, তবুও ব্যাংকে তারল্য সংকট কেন?

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ১৯৯৩ সালের পর সর্বনিম্ন। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নন। নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক অস্বাভাবিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যায়, তখন ব্যাংকের হাতে নগদ অর্থ বা তারল্য বাড়ার কথা। কারণ নতুন ঋণ বিতরণ কম হলে আমানতের একটি বড় অংশ ব্যাংকের ভাণ্ডারেই থেকে যায়। কিন্তু দেশের বাস্তব চিত্র যেন সেই প্রচলিত নিয়মকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

বর্তমানে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছেন, শিল্পখাতে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমেছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। অথচ একই সময়ে দেশের অনেক ব্যাংক তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যখন নতুন ঋণ বিতরণই কম, তখন ব্যাংকের অর্থ গেল কোথায়?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ১৯৯৩ সালের পর সর্বনিম্ন। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নন। নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বহু ব্যাংক গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতেও হিমশিম খাচ্ছে। ফলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে একাধিকবার জরুরি তারল্য সহায়তা দিতে হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শুধু একটি বড় ইসলামী ব্যাংককেই ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। গত দেড় বছরে সংকটে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট তারল্য সহায়তা ৭৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি ছাড়িয়ে গেছে।

এ ধরনের সহায়তা মূলত গ্রাহকদের দৈনন্দিন লেনদেন সচল রাখার জন্য দেওয়া হয়। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি কেবল সাময়িক সমাধান। ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক দুর্বলতা দূর করতে হলে মূল সমস্যার সমাধান করতে হবে।

ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দেড় দশকে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রভাবশালী কিছু শিল্পগোষ্ঠী একাধিক ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল জামানত, শিথিল যাচাই-বাছাই এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল নজরদারির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ অনুমোদন পেয়েছে।

ফলে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কাগজে-কলমে ঋণ সম্পদ হিসেবে থাকলেও বাস্তবে সেই অর্থের বড় অংশ আর ব্যাংকে ফিরে আসেনি।

ব্যাংকিং খাতের সংকটের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে বিপুল অঙ্কের অর্থপাচার এবং অনাদায়ী ঋণ। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে অনুমোদিত বড় অঙ্কের ঋণের একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে অথবা এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছে, যেখান থেকে অর্থ ফেরত আসেনি।

এর ফলে ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে ঋণ সম্পদ হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে সেই অর্থ নগদ প্রবাহে যুক্ত হয়নি। তাই নতুন ঋণ কমে গেলেও পুরোনো অর্থ ফেরত না আসায় তারল্য সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে সমস্যাগ্রস্ত বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকারও বেশি, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশের সমান। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে ফিরে না আসায় নগদ অর্থের প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

সাম্প্রতিক ব্যাংকিং সেক্টর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

এছাড়া কয়েকটি ব্যাংকের অ্যাডভান্স-টু-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) ১২০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ তারা যত টাকা আমানত হিসেবে সংগ্রহ করেছে, তার চেয়েও বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। ফলে গ্রাহকরা একসঙ্গে টাকা তুলতে চাইলে সেই অর্থ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংককে রেপো সুবিধা, আন্তঃব্যাংক অর্থায়ন এবং বিশেষ তারল্য সহায়তার মাধ্যমে এসব ব্যাংককে সচল রাখতে হচ্ছে।

বর্তমানে ব্যবসায়ীরা শুধু ঋণের সুদের হার নিয়েই চিন্তিত নন। তাদের সামনে আরও বড় কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে।

বর্তমান সময়ে উচ্চ সুদহার, গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ ঘাটতি, রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া, ডলারের বাজারে অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ এবং বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থার সংকট নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে।

অনেক উদ্যোক্তার মতে, শুধু ব্যাংক থেকে ঋণ পেলেই ব্যবসা সফল হবে না। যদি কারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস বা বিদ্যুৎ না থাকে, তাহলে নতুন বিনিয়োগ করে উৎপাদন চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে।

মজার বিষয় হলো, সামগ্রিকভাবে দেশে আমানতের প্রবৃদ্ধি আবার বাড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ডলারের বাজারেও আগের তুলনায় স্থিতিশীলতা এসেছে।

তবে এই বাড়তি আমানতের বেশিরভাগই যাচ্ছে আর্থিকভাবে শক্তিশালী এবং সুশাসনসম্পন্ন ব্যাংকগুলোতে। বিপরীতে দুর্বল ব্যাংকগুলোতে নতুন আমানত কম জমা হচ্ছে। অনেক গ্রাহক বরং পুরোনো আমানত তুলে নিয়ে নিরাপদ মনে করা ব্যাংকে স্থানান্তর করছেন।

ফলে দুর্বল ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে বর্তমান সরকারও সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।

সংস্কারের অংশ হিসেবে দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, ব্যাংক রেজুলেশন আইন, খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল দিতে পারে। তবে বহু বছরের অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন এবং বিপুল খেলাপি ঋণের প্রভাব এক বা দুই বছরে দূর করা সম্ভব নয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি অর্থ সহায়তার ওপর নির্ভর করে এই সংকট কাটানো যাবে না। ব্যাংক খাতকে টেকসই করতে হলে খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে, করপোরেট সুশাসন জোরদার করতে হবে এবং অর্থপাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

একই সঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিল্পখাতের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। কারণ ব্যবসায়ীরা যখন নতুন বিনিয়োগে ফিরে আসবেন এবং পুরোনো ঋণ নিয়মিত পরিশোধ হবে, তখনই ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হবে।

আর্কাইভ