বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী, নৃত্যশিল্পী ও মডেল নোরা ফাতেহি আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পরিচিত এক তারকা। অসংখ্য জনপ্রিয় গানে পারফরম্যান্স, সিনেমায় অভিনয় এবং টেলিভিশন শোতে উপস্থিতির মাধ্যমে তিনি কোটি ভক্তের মন জয় করেছেন। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে অনেক সংগ্রাম, প্রত্যাখ্যান এবং কঠিন অভিজ্ঞতার গল্প। সম্প্রতি এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে নিজের ক্যারিয়ারের শুরুর সময়কার এমনই এক অস্বস্তিকর ঘটনার কথা প্রকাশ করেছেন নোরা, যা ঘটেছিল বাংলাদেশের সুন্দরবনে একটি সিনেমার শুটিং চলাকালে।
নোরার দাবি, শুটিং সেটে এক সহশিল্পীর অসৌজন্যমূলক আচরণের জেরে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে, একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। বহু বছর পর সেই ঘটনা প্রকাশ্যে এনে তিনি জানান, সেই অভিজ্ঞতা এখনও তাঁর স্মৃতিতে স্পষ্টভাবে গেঁথে আছে।
সম্প্রতি ভারতের জনপ্রিয় কমেডি অনুষ্ঠান দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কপিল শো-তে অতিথি হিসেবে হাজির হন নোরা ফাতেহি। অনুষ্ঠান চলাকালে নিজের ক্যারিয়ারের নানা ঘটনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি ২০১৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রোর: টাইগার্স অব দ্য সুন্দরবনস’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কথা তুলে ধরেন।
নোরা জানান, এটি ছিল তাঁর প্রথম দিকের চলচ্চিত্রগুলোর একটি। সিনেমার উল্লেখযোগ্য অংশের শুটিং হয়েছিল বাংলাদেশের সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যে। সেই সময় তিনি অভিনয়ের জগতে একেবারেই নতুন ছিলেন। নতুন পরিবেশ, নতুন সহশিল্পী এবং কঠিন লোকেশনের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।
অনুষ্ঠানে নোরা বলেন, শুটিং চলাকালে একজন সহ-অভিনেতা তাঁর সঙ্গে এমন আচরণ করেছিলেন, যা তিনি একেবারেই মেনে নিতে পারেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি বারবার অসভ্য ও অসম্মানজনক আচরণ করছিলেন।
নোরা জানান, পরিস্থিতি একপর্যায়ে এতটাই বিরক্তিকর হয়ে ওঠে যে তিনি নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। ক্ষোভের বশে প্রথমে তিনি ওই সহশিল্পীকে চড় মারেন।
তাঁর কথায়, বাংলাদেশের সুন্দরবনের জঙ্গলে শুটিং চলছিল। সেখানে একজন সহ-অভিনেতা খুবই অশোভন আচরণ করছিলেন। তাই রাগের মাথায় তিনি তাকে চড় মেরে বসেন।
ঘটনার এখানেই শেষ হয়নি। নোরার বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি চড় মারার পর ওই সহ-অভিনেতাও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখান। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই অভিনেতা নোরাকে চড় মারেন এবং তাঁর চুল টেনে ধরেন।
এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। আত্মরক্ষার জন্য তিনিও ওই অভিনেতার চুল ধরে টান দেন। দুজনের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতি শুরু হলে শুটিং সেটে উপস্থিত অন্য সদস্যরা এগিয়ে আসেন।
নোরা জানান, তিনি আবারও ওই অভিনেতাকে চড় মারেন। এরপর দুজনের মধ্যে বড় ধরনের ঝগড়া শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত পরিচালক এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং দুজনকে আলাদা করেন।
শুটিং ইউনিটের সদস্যরা বিষয়টি দ্রুত সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরিচালক ঘটনাস্থলে এসে দুজনকে শান্ত করেন এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া থেকে রক্ষা করেন।
নোরা বলেন, যদি তখন পরিচালক ও ইউনিটের অন্য সদস্যরা এগিয়ে না আসতেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারত। পরে অবশ্য শুটিংয়ের কাজ স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হয়।
ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিলেও নোরা ফাতেহি সেই সহ-অভিনেতার নাম প্রকাশ করেননি। তিনি কারও বিরুদ্ধে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করতে চান কি না, সে বিষয়েও কিছু বলেননি।
তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, ওই ব্যক্তির আচরণ তাঁর কাছে অত্যন্ত অগ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল। কপিল শর্মা যখন পুরো ঘটনাটি নিয়ে হালকা রসিকতা করেন, তখন নোরা বলেন, ওই ব্যক্তির আচরণ তাঁর কাছে অত্যন্ত খারাপ লেগেছিল। তবে মন্তব্যটি ছিল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেওয়া।
বর্তমানে বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় পারফর্মার হলেও ক্যারিয়ারের শুরুটা নোরার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। কানাডায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী ভারতের চলচ্চিত্র জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করতে দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছেন।
ভাষাগত সমস্যা, নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, অডিশনে ব্যর্থতা এবং সুযোগের অভাব—সব মিলিয়ে শুরুটা ছিল কঠিন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে নোরা একাধিকবার বলেছেন, নতুন শিল্পীদের অনেক সময় নানা ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
সাম্প্রতিক এই ঘটনাও তাঁর সেই সংগ্রামের সময়কার একটি অধ্যায় বলেই মনে করছেন অনেকেই।
‘রোর: টাইগার্স অব দ্য সুন্দরবনস’ ২০১৪ সালের একটি অ্যাডভেঞ্চার-থ্রিলার চলচ্চিত্র। ছবিটি পরিচালনা করেন কমল সদানা এবং এটি মুক্তি পায় ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবর।
সিনেমার কাহিনির বড় একটি অংশ আবর্তিত হয়েছে সুন্দরবনের বিপজ্জনক পরিবেশকে ঘিরে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি, দুর্গম বনাঞ্চল এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবির উল্লেখযোগ্য অংশের শুটিং বাংলাদেশের সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যে সম্পন্ন হয়।
ছবিতে নোরা ফাতেহির পাশাপাশি অভিনয় করেছেন অভিনব শুক্ল, হিমর্শা বেঙ্কটসামী, অচিন্ত কৌর এবং সুব্রত দত্তসহ আরও কয়েকজন শিল্পী।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে শুটিং করা সহজ কোনো কাজ নয়। দুর্গম পরিবেশ, জোয়ার-ভাটা, বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা সবকিছু মিলিয়ে এখানে চলচ্চিত্র নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন।
সিনেমার কলাকুশলীদের দীর্ঘ সময় প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে কাজ করতে হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে এমন পরিবেশে কাজ করার সময় মানসিক চাপও তুলনামূলক বেশি থাকে।
নোরা ফাতেহির এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই তাঁর সাহসের প্রশংসা করেছেন, কারণ দীর্ঘদিন পর হলেও তিনি নিজের অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন।
অন্যদিকে, কিছু নেটিজেন জানতে চেয়েছেন, সেই সহ-অভিনেতা কে ছিলেন। তবে নোরা এ বিষয়ে কোনো নাম উল্লেখ না করায় বিষয়টি নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ না তোলার পক্ষেও মত দিয়েছেন অনেকে।
নোরার অভিজ্ঞতা আবারও মনে করিয়ে দেয়, চলচ্চিত্র শিল্পসহ যেকোনো কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের প্রতি পারস্পরিক সম্মান ও পেশাদার আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শুটিং সেটে অসৌজন্যমূলক আচরণ শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কই নষ্ট করে না, পুরো ইউনিটের কাজেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে বিনোদন জগতে কর্মপরিবেশ আরও নিরাপদ ও সম্মানজনক করার বিষয়ে সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। শিল্পীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।

