ঢাকা মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে ছাতার ভিতরে লুখিয়ে রাখা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতস্যরা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানী জুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা এটা কোনো পরিত্যক্ত বস্তু ছিল না; বরং জনসমাগমকে লক্ষ্য করে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং সম্ভাব্য নাশকতার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে সেখানে রাখা হয়েছিল। আনসার সদস্যদের তৎপরতা ও পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কারা এই বিস্ফোরক ডিভাইসটি সেখানে রেখেছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক আলামত এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছেন।
ঘটনার দিন সন্ধ্যায় ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টোরথের শোভাযাত্রা মতিঝিলের শাপলা চত্বর হয়ে স্বামীবাগ আশ্রমের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছিল। ঠিক সেই সময় মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচতলায় দায়িত্বরত আনসার প্লাটুন কমান্ডার একটি ছাতা দেখতে পান, যার ভেতর থেকে অস্বাভাবিকভাবে আলো জ্বলছিল।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তিনি সঙ্গে সঙ্গে স্টেশন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে মতিঝিল থানা পুলিশ, মেট্রোরেল পুলিশ এবং আনসার সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থল ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেন। পরে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিশ্চিত হয় যে ছাতার ভেতরে একটি সক্রিয় আইইডি রাখা হয়েছে।
ঘটনার সময় শোভাযাত্রাটি ঘটনাস্থলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। সেখানে হাজারো মানুষের উপস্থিতি থাকায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। তাই পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে বিস্ফোরকের তথ্য প্রকাশ না করে এলাকায় ‘শর্ট সার্কিট’ হয়েছে বলে জানায় এবং শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের নিরাপদভাবে বিকল্প পথ দিয়ে এগিয়ে যেতে অনুরোধ করে।
শোভাযাত্রা এলাকা অতিক্রম করার পর বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে ডিভাইসটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করে।
বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া ডিভাইসটি ছিল একটি পাইপ বোমা বা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি)। এর ভেতরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিস্ফোরক উপাদানের পাশাপাশি বেয়ারিং বল, তারকাঁটা এবং ধারালো ধাতব টুকরো রাখা হয়েছিল, যা বিস্ফোরণের পর প্রাণঘাতী স্প্লিন্টারে পরিণত হতে পারত।
এছাড়া ডিভাইসটির সঙ্গে ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সার্কিট এবং ছাতার খোলার বোতামের সংযোগ ছিল। অর্থাৎ কেউ ছাতাটি স্বাভাবিকভাবে খুলতে গেলেই বিস্ফোরণ ঘটার সম্ভাবনা ছিল। তদন্তকারীদের মতে, এটি পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা একটি ট্র্যাপ ডিভাইস, যা জনসমাগমে বড় ধরনের হতাহতের কারণ হতে পারত।
নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থল থেকে জিআই পাইপের অংশ, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সার্কিট, বেয়ারিং বল এবং অন্যান্য উপাদান সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব আলামত পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।
ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিস্ফোরকের প্রকৃতি, ব্যবহৃত উপকরণ এবং ডিভাইস তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ডিভাইসটি নিষ্ক্রিয় করার সময় একটি স্প্লিন্টার ছিটকে এসে মিরাজ আহমেদ নামে ৬৬ বছর বয়সী এক পথচারীর বাম চোখে আঘাত করে। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মচারী।
প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকরা তার চিকিৎসা অব্যাহত রেখেছেন।
ঘটনার পর মতিঝিল থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে বিস্ফোরকটি রাখা হয়েছিল।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা গোষ্ঠীর নাম নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য থেকে বিরত রয়েছে পুলিশ।
তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল এবং আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের গতিবিধি বিশ্লেষণ করছেন।
মেট্রোরেল পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্টেশনের বাইরের অংশে তাদের নিজস্ব সিসিটিভি ব্যবস্থা নেই। ফলে আশপাশের ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সড়কে স্থাপিত ক্যামেরার ফুটেজের ওপরই তদন্ত অনেকাংশে নির্ভর করছে।
বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের কর্মকর্তাদের মতে, উদ্ধার হওয়া ডিভাইসটি মোটামুটি শক্তিশালী ছিল। পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষার পর এর বিস্ফোরণ ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাবে।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, এটি জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় রাখা হয়েছিল এবং সময়ের দিক থেকেও ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রাথমিকভাবে নাশকতার উদ্দেশ্যের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কারা ডিভাইসটি সেখানে রেখে গেছে, তা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তদন্তে সিটিটিসি, থানা পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ইউনিট একসঙ্গে কাজ করছে।
ফরেনসিক রিপোর্ট, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার পরই ঘটনার প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ও জড়িতদের সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
মতিঝিলের মতো ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কীভাবে একটি বিস্ফোরক ডিভাইস দীর্ঘ সময় ধরে নজরের বাইরে থাকতে পারল, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসমাগমপূর্ণ এলাকা, গণপরিবহন কেন্দ্র এবং ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানের আশপাশে নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি।
বিশেষ করে যদি শোভাযাত্রা চলাকালে ডিভাইসটি বিস্ফোরিত হতো, তাহলে প্রাণহানির সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারত। সে বিবেচনায় আনসার সদস্যদের সতর্কতা, পুলিশের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের দক্ষতা সম্ভাব্য বড় বিপর্যয় প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তথ্য সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

