মধ্যপ্রাচ্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী আবারও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ইরানের সংবাদমাধ্যমের দাবি, হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার নৌমাইনের বিস্ফোরণের কবলে পড়ে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অভিযোগ, জাহাজটি ইরানের নির্ধারিত নিরাপদ নৌপথ ছেড়ে অন্য একটি রুটে প্রবেশ করেছিল। সেই কারণেই এটি আগে থেকে পাতা নৌমাইনের সংস্পর্শে আসে এবং বিস্ফোরণ ঘটে।
যদিও এই ঘটনার বিষয়ে ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি, তবে সংবাদটি সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহণ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় দুই ভারতীয় নাবিক নিখোঁজ হওয়ার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরানের সংবাদসংস্থা তাসনিম নিউজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় ইরানের নির্ধারিত নিরাপদ নৌপথ অনুসরণ করেনি। পরিবর্তে অন্য একটি রুট ব্যবহার করার সময় সেটি পানির নিচে পেতে রাখা নৌমাইনের সংস্পর্শে আসে।
এরপরই জোরালো বিস্ফোরণ ঘটে এবং জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্ফোরণের মাত্রা কতটা ছিল, জাহাজটির কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে কিংবা কোনও নাবিক হতাহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ইরান প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। ফলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়।
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এবং কৌশলগত সামুদ্রিক রুট হলো হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগরের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে।
প্রতিদিন বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ প্রণালী দিয়ে চলাচল করে। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজে কোনও ধরনের সামরিক সংঘাত বা নৌচলাচলে বিঘ্ন ঘটলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ, এশিয়া এবং বিশ্বের বহু দেশের অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর ইরান হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
সেই সময় ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) প্রণালীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নৌমাইন বসায় বলে দাবি করা হয়।
পরে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, কোন কোন এলাকায় মাইন স্থাপন করা হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ অবস্থান পরে আর নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ায়, কারণ দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকা মাইন বেসামরিক জাহাজের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে সাধারণত নির্দিষ্ট নেভিগেশন করিডর থাকে। বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় জাহাজগুলোকে নির্ধারিত নিরাপদ রুট ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
যদি কোনও জাহাজ সেই নির্ধারিত পথ ছেড়ে অন্যদিকে চলে যায়, তাহলে সেটি অচিহ্নিত নৌমাইন, সামরিক নজরদারি কিংবা অন্যান্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই ঘটনায়ও সংবাদমাধ্যমের দাবি, নিরাপদ রুট ছেড়ে যাওয়ার কারণেই ট্যাঙ্কারটি বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে। যদিও এই দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হরমুজ প্রণালীতে এমন ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোকে নতুন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হতে পারে।
এর ফলে—
- জাহাজ চলাচলের বীমা খরচ বেড়ে যেতে পারে।
- তেল পরিবহণে বিলম্ব হতে পারে।
- জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
- বিকল্প সমুদ্রপথ ব্যবহারের কারণে পরিবহণ ব্যয় বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
হরমুজের ঘটনার মধ্যেই আরেকটি উদ্বেগজনক খবর এসেছে ইউক্রেন থেকে।
ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। হামলার সময় জাহাজটি বন্দরে নোঙর করা ছিল।
ভারতের কিয়েভস্থ দূতাবাস জানিয়েছে, আক্রান্ত জাহাজটির নাম ‘এজিএন র্যাগনার’।
জাহাজটিতে মোট চারজন ভারতীয় নাবিক কর্মরত ছিলেন।
হামলার পর চারজন ভারতীয় নাবিকের মধ্যে দু’জন নিরাপদে উদ্ধার হলেও বাকি দুইজনের এখনও কোনও সন্ধান মেলেনি।
নিখোঁজ নাবিকদের খুঁজে বের করতে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, উদ্ধারকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
ভারতের দূতাবাস জানিয়েছে, তারা ইউক্রেনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং পরিস্থিতির উপর নিবিড় নজরদারি করছে।
এখনও পর্যন্ত ওডেসা বন্দরে হামলার দায় কোনও পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান থাকায় অনেকের ধারণা, এই হামলার সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির যোগ থাকতে পারে। তবে নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনও পক্ষকে দায়ী করা সম্ভব নয়।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার প্রকৃত কারণ ও দায়ী পক্ষ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালী এবং কৃষ্ণসাগর—দুই এলাকাই বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল সামুদ্রিক অঞ্চলের মধ্যে পড়ে।
একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ—এই দুই সংকট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপরিবহণকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বিশ্বজুড়ে বহু শিপিং কোম্পানি ইতিমধ্যেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। কোথাও অতিরিক্ত নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে, কোথাও আবার বিকল্প রুট ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার ভারতীয় নাবিক বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে কর্মরত। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে তাঁদের কাজ করার ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি।
ওডেসার সাম্প্রতিক ঘটনার পর ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিবারগুলিও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহণে কর্মরত নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুদ্ধপ্রবণ এলাকায় অতিরিক্ত সতর্কতা, উন্নত নজরদারি এবং দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থার ওপর আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।
হরমুজ প্রণালীতে নৌমাইনের বিস্ফোরণে তেলবাহী ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি এবং একই সময়ে ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরে ভারতীয় নাবিক বহনকারী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা বিশ্ব সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও হরমুজের ঘটনায় এখনও আনুষ্ঠানিক সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি এবং ওডেসা হামলার দায়ও স্পষ্ট নয়, তবুও দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। আগামী দিনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর তদন্ত ও সরকারি বিবৃতির দিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।

