রাজধানীর মতিঝিলের বহুল আলোচিত শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে এই অভিযোগপত্র জমা দেওয়াকে মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) সকাল প্রায় পৌনে ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জমা দেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মার্জিনা রায়হান। অভিযোগ দাখিলের মধ্য দিয়ে মামলাটি এখন বিচারিক পর্যায়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
একই দিনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারিক বেঞ্চে এ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ অভিযোগপত্র গ্রহণ, পর্যবেক্ষণ এবং পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণ করবেন।
আদালত অভিযোগপত্র পর্যালোচনার পর অভিযোগ গ্রহণ করবেন কি না, অথবা প্রসিকিউশনকে কোনো অতিরিক্ত তথ্য বা নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেবেন কি না তা শুনানির পর নির্ধারিত হবে। অভিযোগ গৃহীত হলে মামলার বিচার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার পথ আরও সুগম হবে।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মোট ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু, সাংবাদিক ফারজানা রূপা এবং লেখক শাহরিয়ার কবীরের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এছাড়া তদন্তে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে আরও কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগপত্রে প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে।
মামলাটির তদন্ত দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত হয়। তদন্তকারী সংস্থা বিভিন্ন নথিপত্র, ভিডিও ফুটেজ, আলোকচিত্র, সংবাদ প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে।
সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র তৈরি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় এখন আদালত অভিযোগপত্রের আইনি ভিত্তি, উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রাথমিক গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করবে।
শাপলা চত্বরের ঘটনাটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়। ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ১৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে।
সারা দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করে। সমাবেশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাতে পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) যৌথ অভিযান পরিচালনা করে।
গভীর রাতের ওই অভিযানের মাধ্যমে শাপলা চত্বর খালি করা হয়। অভিযানের সময় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন ধরনের দাবি ও পাল্টা দাবি সামনে আসে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক মহলের কিছু পর্যবেক্ষণের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়।
শাপলা চত্বরের অভিযানে বহু মানুষ নিহত, আহত ও নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়।
তদন্তে অভিযানের পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চালানো হয়। তদন্ত শেষে প্রসিকিউশন মনে করে, সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনার মতো যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। সেই কারণেই আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।
তবে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে এমনটি বলা যায় না। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক অভিযুক্ত আইনগতভাবে নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হন।
ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল কোনো মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ধাপ। তদন্ত শেষ হওয়ার পর প্রসিকিউশন যখন মনে করে যে আদালতে বিচার শুরু করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, তখন তারা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জমা দেয়।
এরপর আদালত অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন যে অভিযোগ গঠন করা হবে কি না। অভিযোগ গঠিত হলে সাক্ষ্য গ্রহণ, জেরা, নথি উপস্থাপন এবং অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। ফলে বর্তমান পদক্ষেপকে মামলার বিচারিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময়ে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।
অন্যদিকে ঘটনাটিকে ঘিরে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুরু হওয়া বিচারিক কার্যক্রমের দিকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল গভীর আগ্রহ নিয়ে নজর রাখছে।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর আদালত প্রথমে অভিযোগপত্র গ্রহণযোগ্য কি না, তা নির্ধারণ করবেন। অভিযোগ গ্রহণ করা হলে পরবর্তী ধাপে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং বিচার কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রসিকিউশন আদালতে তাদের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করবে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের পক্ষেও আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ থাকবে। আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আইনি যুক্তি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত রায় প্রদান করবেন।

