ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ নিজেদের অভিযান শুরু করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। তবে প্রথম ম্যাচে প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দেখাতে পারেনি সেলেসাওরা। নিউ জার্সির নিউজার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত গ্রুপ ‘সি’-এর উদ্বোধনী ম্যাচে আফ্রিকার শক্তিশালী দল মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র করেছে ব্রাজিল। ফলাফল শুধু হতাশাজনকই নয়, মাঠের খেলাও ব্রাজিল সমর্থকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ম্যাচজুড়ে মরক্কোর আধিপত্য, ব্রাজিলের মাঝমাঠের দুর্বলতা এবং আক্রমণভাগের অকার্যকারিতা ফুটবল বিশ্লেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। প্রশ্ন উঠছে—কার্লো আনচেলত্তির অধীনে গড়ে ওঠা এই ব্রাজিল কি সত্যিই বিশ্বকাপ জয়ের মতো প্রস্তুত?
মরক্কোর আগ্রাসী শুরু, ব্রাজিলের রক্ষণে চাপ
খেলার শুরু থেকেই মরক্কো আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয়। প্রথম ১০ মিনিটেই তারা একাধিকবার ব্রাজিলের গোলমুখে শট নেয়। যদিও অভিজ্ঞ গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার শুরুতে দলকে বিপদমুক্ত রাখেন, তবুও চাপ বাড়তেই থাকে।
অবশেষে ২১তম মিনিটে সেই চাপের ফল পায় মরক্কো। ব্রাহিম দিয়াজের নিখুঁত থ্রু বল ধরে ইসমাইল সাইবারি ব্রাজিলের রক্ষণভাগ ভেদ করে এগিয়ে যান এবং অ্যালিসনের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে দলকে এগিয়ে দেন।
গোল হজমের পরও ব্রাজিল নিজেদের ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিল না। মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় মরক্কো সহজেই খেলার গতি নির্ধারণ করছিল।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের জাদুকরী গোল ব্রাজিলকে ফেরায় ম্যাচে
ম্যাচের ধারার বিপরীতে ৩২তম মিনিটে সমতায় ফেরে ব্রাজিল। গোলটির পুরো কৃতিত্বই যায় ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ঝলমলে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের কাছে।
ব্রুনো গুইমারেসের সঙ্গে দুর্দান্ত ওয়ান-টু খেলে বাম দিক থেকে দ্রুত পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়েন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। এরপর ডান পায়ের শক্তিশালী ও বাঁকানো শটে মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুকে পরাস্ত করে বল জড়িয়ে দেন জালের উপরের কোণায়।
এই গোল শুধু ব্রাজিলকে ম্যাচে ফেরায়নি, বরং দেখিয়ে দিয়েছে কঠিন মুহূর্তে ভিনিসিয়ুস কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন।
দ্বিতীয়ার্ধে কৌশলের লড়াই, হার এড়ানোই ছিল লক্ষ্য
বিরতির পর ম্যাচের গতি কিছুটা বদলে যায়। উভয় দলই সতর্ক ফুটবল খেলতে শুরু করে। কোচরা একাধিক পরিবর্তন আনলেও আক্রমণের ধার কমে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধে মরক্কো আবারও মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। তারা বলের দখল ধরে রেখে ব্রাজিলকে রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দেয়। শেষ মুহূর্তে কয়েকটি বিপজ্জনক আক্রমণও তৈরি করে আফ্রিকান দলটি।
তবে অ্যালিসন বেকারের অসাধারণ দৃঢ়তা ব্রাজিলকে হার থেকে বাঁচায়। বিশেষ করে যোগ করা সময়ে তার ডাবল সেভ ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
ব্রাজিলের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ: কে উজ্জ্বল, কে ব্যর্থ?
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ছিলেন একাই আলোর উৎস
পুরো ম্যাচে ব্রাজিলের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় ছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমির কঠোর মার্কিংয়ের মধ্যেও তিনি বারবার প্রতিপক্ষের রক্ষণে ভয় সৃষ্টি করেছেন।
তার দুর্দান্ত গোলের পাশাপাশি আক্রমণে সৃজনশীলতার প্রায় সবটুকুই এসেছে তার পা থেকে। স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন তিনি।
ব্রুনো গুইমারেসের মিশ্র পারফরম্যান্স
ভিনিসিয়ুসের গোলে অ্যাসিস্ট করলেও মাঝমাঠে নিজের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে পারেননি ব্রুনো গুইমারেস। আক্রমণে অতিরিক্ত উঠে যাওয়ায় মাঝমাঠে বড় ফাঁক তৈরি হয়, যা মরক্কো বারবার কাজে লাগায়।
রাফিনিয়ার হতাশাজনক রাত
বার্সেলোনা তারকা রাফিনিয়া ম্যাচে একেবারেই নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন। ডান প্রান্তে তাকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়েছে। একটি ভালো সুযোগ পেলেও দুর্বল শটে সেটি নষ্ট করেন তিনি।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে তার কাছ থেকে আরও অনেক বেশি প্রত্যাশা ছিল।
কাসেমিরোর ফর্ম নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার কাসেমিরো পুরো ম্যাচে প্রভাবহীন ছিলেন। প্রথমার্ধেই হলুদ কার্ড দেখেন এবং বিরতির সময় তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়।
তার পরিবর্তে নামা ফাবিনহো কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনলেও মাঝমাঠের সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি।
অ্যালিসন বেকারই বাঁচালেন ব্রাজিলকে
যদি অ্যালিসন না থাকতেন, তাহলে ব্রাজিল হয়তো প্রথম ম্যাচেই পরাজয় দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করত। শেষ মুহূর্তের দুটি অবিশ্বাস্য সেভ তার অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তারই প্রমাণ।
আক্রমণ ও রক্ষণে হতাশা
স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগো সহজ একটি হেড নষ্ট করেন, যা গোল হতে পারত। অন্যদিকে রক্ষণে রজার ইবানিয়েজও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না। মরক্কোর গোলের সময় তার অবস্থানগত ভুল স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছে।
নেইমারের অনুপস্থিতি কতটা প্রভাব ফেলেছে?
ব্রাজিলের সৃজনশীল আক্রমণের ঘাটতি স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। ইনজুরির কারণে নেইমার মাঠে ছিলেন না এবং কোচ আনচেলত্তি জানিয়েছেন, তিনি এখনো পুরোপুরি ফিট নন।
নেইমারের অভিজ্ঞতা, পাসিং এবং আক্রমণ সাজানোর ক্ষমতা এই ম্যাচে ব্রাজিলের জন্য বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারত। ফলে তার দ্রুত প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে সমর্থকরা।
মরক্কো আবারও প্রমাণ করল নিজেদের শক্তি
২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পৌঁছানো যে কাকতালীয় ঘটনা ছিল না, তা আবারও দেখিয়ে দিল মরক্কো।
দলটি শুধু রক্ষণে শক্তিশালী ছিল না, আক্রমণেও ধারালো ফুটবল খেলেছে। তাদের সংগঠিত ডিফেন্স, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল ব্রাজিলকে পুরো ম্যাচজুড়ে চাপে রেখেছে।
গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু আগের বিশ্বকাপের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। আর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পুরো ম্যাচে মরক্কোর কোনো খেলোয়াড় হলুদ কার্ড দেখেননি, যা তাদের শৃঙ্খলারই প্রমাণ।
গরম আবহাওয়া কি ব্রাজিলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ?
নিউ জার্সির তীব্র গরম ম্যাচের আগে থেকেই আলোচনায় ছিল। মরক্কোর কোচও স্বীকার করেছেন, আবহাওয়া খেলোয়াড়দের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
তবে মরক্কো শুরু থেকেই উচ্চ গতির ফুটবল খেলতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ব্রাজিলের কিছু খেলোয়াড়, বিশেষ করে কাসেমিরো, গরমে ভুগেছেন বলেই মনে হয়েছে।
বিশ্বকাপের দীর্ঘ যাত্রায় বিভিন্ন আবহাওয়ার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া ব্রাজিলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ব্রাজিল কতদূর যেতে পারে?
প্রথম ম্যাচের পারফরম্যান্স থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হয়েছে।
প্রথমত, নেইমারের প্রত্যাবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ফিরলে আক্রমণে সৃজনশীলতা ও বৈচিত্র্য বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, মাঝমাঠের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। কাসেমিরোর বর্তমান ফর্ম উদ্বেগজনক। ব্রুনো গুইমারেস ও ফাবিনহোর সমন্বয় কিংবা নতুন বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে কোচ আনচেলত্তিকে।
তৃতীয়ত, শুধু ভিনিসিয়ুসের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। রাফিনিয়া, পাকেতা, কুনিয়া এবং অন্য আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দেরও বড় ভূমিকা নিতে হবে।
চতুর্থত, গ্রুপ পর্বে সামনে অপেক্ষাকৃত সহজ প্রতিপক্ষ রয়েছে। হাইতির বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচ ব্রাজিলের জন্য আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার বড় সুযোগ হতে পারে।
বিশ্বকাপ জয়ের পথে সতর্ক সংকেত
প্রথম ম্যাচে ড্র কোনো বিপর্যয় নয়। ইতিহাস বলছে, অনেক দলই ধীরগতিতে বিশ্বকাপ শুরু করে পরে শিরোপা জিতেছে। তবে ব্রাজিলের খেলায় যে দুর্বলতাগুলো দেখা গেছে, সেগুলো দ্রুত সমাধান না করলে নকআউট পর্বে বড় শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে টিকে থাকা কঠিন হবে।
ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, স্পেন, ইংল্যান্ড কিংবা পর্তুগালের মতো দলগুলোর বিপক্ষে সফল হতে হলে ব্রাজিলকে আরও সংগঠিত, কার্যকর এবং আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলতে হবে।
বিশ্বকাপের পথ এখনো দীর্ঘ। তবে মরক্কোর বিপক্ষে কষ্টার্জিত ড্র স্পষ্ট করে দিয়েছে—শুধু তারকাখচিত দল থাকলেই চ্যাম্পিয়ন হওয়া যায় না। মাঠে সেই সামর্থ্যের প্রমাণও দিতে হয়। ব্রাজিল কি সেই প্রমাণ দিতে পারবে? উত্তর মিলবে আগামী ম্যাচগুলোতে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।

