বিশ্বকাপের মঞ্চে অবশেষে জয়ের দেখা পেল ব্রাজিল। হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের দাপুটে জয় তুলে নিয়ে টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম তিন পয়েন্ট অর্জন করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে স্কোরলাইন যতটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে, মাঠের পারফরম্যান্স ততটা নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না। কারণ পুরো ম্যাচজুড়ে ব্রাজিলের ফুটবলে যেমন ছিল ভিনিসিয়াস জুনিয়রের অসাধারণ প্রভাব, তেমনি ছিল দলগত নির্ভরতার উদ্বেগও।
এক সময় ব্রাজিলের আক্রমণভাগের সমস্ত আশা-ভরসা ছিল নেইমার জুনিয়রকে ঘিরে। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন সেই দায়িত্ব এসে পড়েছে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের কাঁধে। হাইতির বিপক্ষে ম্যাচে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাকে বর্তমান ব্রাজিল দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় বলা হয়।
একটি গোল করার পাশাপাশি আরও দুটি গোল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা। তার গতি, ড্রিবলিং এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা হাইতির রক্ষণকে বারবার বিপর্যস্ত করে দেয়। ম্যাচের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন ব্রাজিলের সবচেয়ে প্রাণবন্ত ফুটবলার।
অনেকেই ভেবেছিলেন হাইতি হয়তো রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলবে এবং পুরো ম্যাচে নিজেদের অর্ধেই অবস্থান করবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্রটি শুরু থেকেই সাহসী ফুটবল উপহার দেয়।
তারা শুধু রক্ষণ সামলানোর চেষ্টা করেনি, বরং ব্রাজিলের ডিফেন্সে নিয়মিত আক্রমণ চালিয়েছে। ছোট ছোট পাস, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং বল দখলে রাখার প্রচেষ্টায় তারা বেশ কয়েকবার ব্রাজিলকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল।
বিশ্বকাপের এবারের আসরে ছোট দলগুলোর চমক দেখানোর প্রবণতা ইতোমধ্যেই আলোচনায় এসেছে। সেই ধারাবাহিকতায় হাইতিও শুরুতে ব্রাজিলকে সহজে খেলতে দেয়নি।
ম্যাচের ২৩তম মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত ব্রেকথ্রু। বাম দিক দিয়ে দুর্দান্ত একক প্রচেষ্টায় বক্সে ঢুকে শট নেন ভিনিসিয়াস। হাইতির গোলরক্ষক জনি প্লাসিদে প্রথম শটটি ঠেকাতে সক্ষম হলেও ফিরতি বলে সুযোগ পান ম্যাথিয়াস কুনহা। ফাঁকা জালে বল জড়াতে কোনো ভুল করেননি তিনি।
এরপর ৩৬ মিনিটে আবারও দেখা যায় ভিনি-কুনহা জুটির কার্যকারিতা। ভিনিসিয়াসের নিখুঁত পাস ধরে প্রথম পোস্টের দিকে শক্তিশালী শটে দ্বিতীয় গোল করেন কুনহা। দুই গোলের ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর ব্রাজিল অনেকটাই স্বস্তি ফিরে পায়।
প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে ব্রাজিল শিবিরে আসে বড় ধাক্কা। ইনজুরির কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন রাফিনহা। বার্সেলোনা তারকা মৌসুমের শেষ ভাগেও চোটের সমস্যায় ভুগেছিলেন। সেই পুরোনো শঙ্কাই যেন আবার ফিরে এলো।
রাফিনহার চোট আন্সেলোত্তির জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ দলে তার বিকল্প হিসেবে সমমানের অভিজ্ঞ ও কার্যকর উইঙ্গার খুব বেশি নেই।
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে নিজের নামও স্কোরশিটে তোলেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। মাঝমাঠ থেকে লুকাস পাকেতার চমৎকার থ্রু পাস ধরে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন তিনি।
শান্ত ও নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে পাঠিয়ে ব্রাজিলকে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল দ্বিতীয়ার্ধে হয়তো আরও বড় জয় পেতে যাচ্ছে সেলেসাওরা।
প্রথমার্ধের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের কাছ থেকে আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল প্রত্যাশা করেছিলেন সমর্থকরা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র।
ভিনিসিয়াসের প্রভাব কিছুটা কমে যেতেই ব্রাজিলের আক্রমণভাগ ছন্দ হারায়। মাঝমাঠ ও ফরোয়ার্ড লাইনের মধ্যে সমন্বয় কমে যায়। ফলে দলটিকে অনেকটাই ছন্নছাড়া দেখায়।
অন্যদিকে হাইতি পাল্টা আক্রমণে বেশ কয়েকবার বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে। বিশেষ করে কর্নার কিক থেকে তারা গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। তবে গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকারের দক্ষতায় রক্ষা পায় ব্রাজিল।
ম্যাচে ৩-০ ব্যবধানে জয় পেলেও ব্রাজিলের গোল মিস করার প্রবণতা উদ্বেগজনক। গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলির একটি শট ক্রসবারে আঘাত করে ফিরে আসে। ডগলাস স্যান্টোস সহজ সুযোগ নষ্ট করেন। এছাড়া এন্ড্রিকের একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়।
সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারলে জয়ের ব্যবধান আরও বড় হতে পারত। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে সুযোগ নষ্ট করার প্রবণতা ভবিষ্যতের কঠিন ম্যাচগুলোতে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
হাইতির বিপক্ষে জয় ব্রাজিলকে আত্মবিশ্বাস দিলেও সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। পরবর্তী ম্যাচে স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হবে তারা।
সেই ম্যাচের আগে কোচ কার্লো আন্সেলোত্তিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
- রাফিনহার অনুপস্থিতিতে ডান প্রান্তে কে খেলবেন?
- ভিনিসিয়াস যদি নিজের সেরা ফর্মে না থাকেন, তাহলে দলের আক্রমণভাগের নেতৃত্ব কে নেবে?
- গোল মিসের সমস্যা কীভাবে কমানো যাবে?
- এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নেইমার জুনিয়র কবে মাঠে ফিরবেন?
হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় নিঃসন্দেহে ব্রাজিলের জন্য স্বস্তির খবর। তবে এই জয় যতটা না দলগত আধিপত্যের গল্প, তার চেয়ে বেশি ভিনিসিয়াস জুনিয়রের ব্যক্তিগত উজ্জ্বলতার প্রতিচ্ছবি। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে ব্রাজিলকে শুধু একজন তারকার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। কারণ বড় টুর্নামেন্টে শিরোপা জিততে হলে দরকার পুরো দলের সম্মিলিত শক্তি।
ভিনিসিয়াস এখন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কিন্তু শুধুমাত্র তার জাদুতেই বিশ্বকাপ জয় সম্ভব নয়—এটাই হাইতির বিপক্ষে জয়ের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

