ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে ধীরগতির শুরু কাটিয়ে অবশেষে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পেয়েছে ব্রাজিল। হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের স্বস্তিদায়ক জয় শুধু তিন পয়েন্টই এনে দেয়নি, বরং কার্লো আনচেলত্তির দলের আক্রমণভাগ নিয়ে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। তবে এই জয়ের আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেনি ব্রাজিল শিবির। কারণ ম্যাচের প্রথমার্ধেই চোট নিয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন দলের গুরুত্বপূর্ণ উইঙ্গার রাফিনিয়া।
লিংকন ফিনান্সিয়াল ফিল্ডে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ব্রাজিল শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করে। মরক্কোর বিপক্ষে হতাশাজনক ১-১ ড্রয়ের পর সমালোচনার মুখে থাকা দলটি এদিন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও সংগঠিত ফুটবল উপহার দেয়।
ম্যাচের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় ছিলেন মাতেউস কুনহা। মরক্কোর বিপক্ষে সুযোগ পাওয়া ইগর থিয়াগোর পরিবর্তে একাদশে সুযোগ পেয়ে তিনি নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেন দারুণভাবে।
কুনহা শুধু গোলই করেননি, পুরো আক্রমণভাগে গতি ও সৃজনশীলতা এনে দিয়েছেন। তার দ্বিতীয় গোলটি ছিল অসাধারণ। বাম পায়ের শক্তিশালী শটে তিনি বল জালের ছাদে পাঠিয়ে হাইতির গোলরক্ষককে কোনো সুযোগই দেননি।
তার উপস্থিতিতে ভিনিসিয়াস জুনিয়র ও রাফিনিয়াও অনেক বেশি স্বাধীনভাবে খেলতে পেরেছেন। ফলে ব্রাজিলের আক্রমণভাগ আগের ম্যাচের তুলনায় অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও কার্যকর দেখিয়েছে।
প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে ব্রাজিলের তৃতীয় গোলটি করেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। সাবেক ওয়েস্ট হ্যাম মিডফিল্ডার লুকাস পাকেতার চমৎকার চিপ পাস থেকে সহজেই বল জালে জড়ান রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা।
ভিনিসিয়াসের এই গোল শুধু ব্যবধান বাড়ায়নি, বরং ব্রাজিলের আক্রমণভাগের সমন্বয়ও তুলে ধরেছে। কুনহা, ভিনিসিয়াস ও রাফিনিয়ার ত্রয়ীকে দেখে মনে হয়েছে, দীর্ঘদিন পর একটি ভারসাম্যপূর্ণ ফরোয়ার্ড লাইন পেতে পারে ব্রাজিল।
যদিও এটি রোনালদো, রিভালদো ও রোনালদিনহোর কিংবদন্তি ত্রয়ীর পর্যায়ে নয়, তবুও প্রতিপক্ষের জন্য যথেষ্ট ভয়ের কারণ হতে পারে।
জয়ের রাতেও ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম রাফিনিয়া। প্রথমার্ধেই চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন বার্সেলোনার এই তারকা।
বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘ টুর্নামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের চোট সবসময়ই উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে যখন দলটি ধীরে ধীরে নিজেদের ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে।
রাফিনিয়ার চোট কতটা গুরুতর, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে তার অনুপস্থিতি ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে কিছুটা দুর্বল করে দিতে পারে।
ব্রাজিলের বর্তমান দলটি প্রতিভায় ভরপুর হলেও একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে—নেইমারকে ছাড়া কি বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব?
কাফ ইনজুরি থেকে সেরে ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নেইমার। তিনি এখনও পুরোপুরি ফিট নন এবং হাইতির বিপক্ষেও বদলি বেঞ্চে জায়গা পাননি।
ব্রাজিলের বর্তমান আক্রমণভাগ কার্যকর হলেও নেইমারের মতো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন খেলোয়াড় খুব কমই আছে। নিজের সেরা সময়ে নেইমার ছিলেন এমন একজন ফুটবলার, যিনি এক মুহূর্তেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারতেন।
যদি আনচেলত্তি নেইমারের কাছ থেকে শেষবারের মতো জাদুকরী পারফরম্যান্স বের করে আনতে পারেন, তাহলে ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হতে পারে।
সাম্প্রতিক দুই বিশ্বকাপেই কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়েছে ব্রাজিলকে। বর্তমান দলটির শক্তি ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করলে এবারও সেই পর্যায় পর্যন্ত যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে হচ্ছে।
মরক্কোর বিপক্ষে তাদের সংগ্রাম এবং হাইতির বিপক্ষে আধিপত্য—দুই চিত্রই ব্রাজিলের বাস্তব অবস্থান তুলে ধরে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এখনও নিজেদের শ্রেষ্ঠ সংস্করণ দেখাতে পারেনি দলটি।
কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। যদি এমনটি হয়, তাহলে ইংল্যান্ড অতীতের তুলনায় অনেক কম ভয় নিয়ে ব্রাজিলের বিপক্ষে মাঠে নামবে।
স্কোরলাইন দেখে মনে হতে পারে ম্যাচটি একতরফা ছিল। কিন্তু বাস্তবে হাইতি যথেষ্ট লড়াই করেছে।
দ্বিতীয়ার্ধে বেশ কয়েকবার গোলের সুযোগ তৈরি করে দলটি। ব্রাজিল গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার অসাধারণ কিছু সেভ না করলে হাইতি অন্তত একটি গোল পেতেই পারত।
বিশেষ করে রিকার্দো অ্যাডের হেড থেকে আসা শট ঠেকাতে অ্যালিসনের দুর্দান্ত সেভ দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।
হাইতির ফুটবলারদের সংগ্রামের গল্প আরও অনুপ্রেরণাদায়ক। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাং সহিংসতার কারণে তারা প্রায় পাঁচ বছর ধরে নিজেদের মাটিতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পারেনি। সেই বাস্তবতা সত্ত্বেও বিশ্বকাপ মঞ্চে তাদের লড়াই প্রশংসার দাবিদার।
অনেকেই ৪৮ দলের বিশ্বকাপ ফরম্যাট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে হাইতির মতো দলগুলোর অংশগ্রহণ এই টুর্নামেন্টকে আরও বৈচিত্র্যময় ও মানবিক করে তুলছে।
তারা হয়তো শিরোপার দাবিদার নয়, কিন্তু তাদের গল্প, সংগ্রাম এবং সমর্থকদের আবেগ বিশ্বকাপকে আরও সমৃদ্ধ করে। ফুটবলের বৈশ্বিক বিস্তারের অন্যতম সুন্দর উদাহরণ হাইতির অংশগ্রহণ।
ম্যাচের পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর। গ্যালারিতে ব্রাজিল ও হাইতির সমর্থকদের উপস্থিতি পুরো স্টেডিয়ামকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
দর্শকদের উচ্ছ্বাস, গান এবং সমর্থন ম্যাচটিকে আরও উপভোগ্য করে তুলেছিল। বিশ্বকাপের আসল সৌন্দর্য যে শুধু মাঠের ফুটবলে নয়, বরং গ্যালারির আবেগেও লুকিয়ে থাকে, এই ম্যাচ তারই প্রমাণ।
হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় ব্রাজিলকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। মাতেউস কুনহার উত্থান, ভিনিসিয়াস জুনিয়রের ধারাবাহিকতা এবং আক্রমণভাগের উন্নতি ব্রাজিল সমর্থকদের আশাবাদী করে তুলেছে। তবে রাফিনিয়ার চোট এবং নেইমারের ফিটনেস নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনও বড় উদ্বেগ।
বিশ্বকাপ জয়ের পথে ব্রাজিলের সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তবে হাইতির বিপক্ষে এই পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে, সেলেসাওরা এখনও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল এবং সঠিক সময়ে নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারলে তারা যেকোনো প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম।

