খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালজাতীয়অর্থনৈতিক অঞ্চলকে আধুনিক শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অর্থনৈতিক অঞ্চলকে আধুনিক শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

দেশের শিল্পখাতকে আরও পরিবেশবান্ধব করার লক্ষ্যেই সরকারের বৃহৎ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতিটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)-এ ব্যাপকভাবে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন ইপিজেডে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার বৃক্ষ রোপণ করা হবে।

বাংলাদেশের শিল্পায়নকে আরও টেকসই, পরিবেশসম্মত এবং আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে সবুজ শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, শিল্পোন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো এমনভাবে পরিকল্পনা ও পরিচালনা করতে হবে, যাতে একদিকে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকে।

সোমবার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর গভর্নিং বোর্ডের সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবেশ রক্ষা এবং অব্যবহৃত শিল্প-সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের বিষয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সভা শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) সাংবাদিকদের জানান, দেশের শিল্পখাতকে আরও পরিবেশবান্ধব করার লক্ষ্যেই সরকারের বৃহৎ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতিটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)-এ ব্যাপকভাবে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন ইপিজেডে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার বৃক্ষ রোপণ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী সভায় বলেন, আধুনিক শিল্পায়নের বর্তমান বিশ্বে শুধুমাত্র কারখানা নির্মাণ বা উৎপাদন বৃদ্ধি করাই যথেষ্ট নয়। শিল্প উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা, সবুজ অবকাঠামো, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে পরিণত করতে হলে শিল্পাঞ্চলগুলোকে পরিবেশবান্ধব রূপে গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে এমনভাবে উন্নয়ন করতে হবে যাতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটি আধুনিক, নিরাপদ ও টেকসই বিনিয়োগ পরিবেশ পান। একই সঙ্গে এসব শিল্পাঞ্চলে সবুজায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্ব দিতে হবে।

সরকার ইতোমধ্যে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবেই দেশের সব ইপিজেডে বড় পরিসরে গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে সবুজ পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং শিল্পকারখানা থেকে নির্গত কার্বন নিঃসরণের প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

উপ-প্রেস সচিব সুজন মাহমুদ বলেন, শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং শিল্পাঞ্চলগুলোকে আরও বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব করে তোলার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হলে শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ যেমন উন্নত হবে, তেমনি শ্রমিকদের জন্যও একটি স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সভায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের গভর্নিং বোর্ডের নবম সভায় গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। কোন প্রকল্প কতদূর এগিয়েছে, কোথায় কী ধরনের সমস্যা রয়েছে এবং সেসব সমস্যা কীভাবে দ্রুত সমাধান করা যায়, সে বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।

এমসয় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগনদের চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন বলে সভা সূত্রে জানা গেছে। একই সাথে তিনি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রশাসনিক জটিলতা না করে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করার গুরুত্বারোপ করেন।

সভায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। শিল্পায়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে কোথায় নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করা যেতে পারে, সে বিষয়ে মতবিনিময় করা হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পরিবেশগত প্রভাব এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সভায় সরকারি মালিকানাধীন অব্যবহৃত শিল্প-সম্পদ কীভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর অবস্থায় থাকা বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমি ও অবকাঠামোকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জের করিম জুট মিলস এবং লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসের জমি ও বিদ্যমান অবকাঠামোকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব স্থানে আধুনিক শিল্পকারখানা স্থাপন করা হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সভায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করতে হলে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্প অবকাঠামো, দ্রুত সেবা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।

এ লক্ষ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া আরও সহজ করার বিষয়েও মতামত উঠে আসে।

সভায় আলোচনায় উঠে আসে যে, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে উৎপাদনশীল শিল্প প্রতিষ্ঠিত হলে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও বিভিন্ন উপায়ে উপকৃত হবেন। ফলে শিল্পায়নের সুফল শুধু বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর ইতিবাচক প্রভাব স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেবাখাতেও পড়বে।

সভায় বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর আবেদন, অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদান সংক্রান্ত বিদ্যমান গাইডলাইন অনুসরণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি সময়ের প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়েও মতবিনিময় হয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, স্বচ্ছ ও কার্যকর নীতিমালা থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়বে এবং নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতাও কমে আসবে।

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে টেকসই শিল্পায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোও পরিবেশবান্ধব শিল্পনীতি গ্রহণ করছে। বাংলাদেশও সেই ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিল্প উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে পর্যাপ্ত সবুজায়ন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি পুনর্ব্যবহার, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের শিল্পখাত আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেজার গভর্নিং বোর্ডের এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তথ্য সূত্র: বাসস