খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

পিঁপড়েরা কীভাবে মিষ্টির খোঁজ পায়? ঘ্রাণশক্তি ও ফেরোমোনের রহস্য

রান্নাঘরে চিনি পড়ে যাওয়া, টেবিলের নিচে মিষ্টির গুঁড়ো জমে থাকা কিংবা চায়ের ফোঁটা মেঝেতে পড়ে থাকা—এসব ঘটনা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খুবই সাধারণ অংশ। বেশিরভাগ...
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালপিঁপড়েরা কীভাবে মিষ্টির খোঁজ পায়? ঘ্রাণশক্তি ও ফেরোমোনের রহস্য

পিঁপড়েরা কীভাবে মিষ্টির খোঁজ পায়? ঘ্রাণশক্তি ও ফেরোমোনের রহস্য

পিঁপড়েদের খাদ্য অনুসন্ধানের পদ্ধতি অত্যন্ত উন্নত এবং সংগঠিত। তাদের এই ক্ষমতার পেছনে কাজ করে ঘ্রাণশক্তি, রাসায়নিক সংকেত, স্মৃতি এবং দলগত আচরণের এক বিস্ময়কর সমন্বয়।

রান্নাঘরে চিনি পড়ে যাওয়া, টেবিলের নিচে মিষ্টির গুঁড়ো জমে থাকা কিংবা চায়ের ফোঁটা মেঝেতে পড়ে থাকা—এসব ঘটনা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খুবই সাধারণ অংশ। বেশিরভাগ সময় আমরা এসব নিয়ে তেমন চিন্তাও করি না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দেখা যায়, কোথা থেকে যেন একদল পিঁপড়ে এসে ঠিক সেই জায়গাটিতেই ভিড় জমিয়েছে। তাদের চলার পথও বেশ গোছানো একটি সারি ধরে তারা খাবারের দিকে এগিয়ে যায় এবং আবার সেই পথ ধরেই ফিরে যায়।

প্রশ্ন হলো, এত ক্ষুদ্র প্রাণী কীভাবে এত দ্রুত খাবারের অবস্থান খুঁজে বের করে? তারা কি দূর থেকে খাবারের গন্ধ পায়, নাকি তাদের অন্য কোনো বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে? বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, পিঁপড়েদের খাদ্য অনুসন্ধানের পদ্ধতি অত্যন্ত উন্নত এবং সংগঠিত। তাদের এই ক্ষমতার পেছনে কাজ করে ঘ্রাণশক্তি, রাসায়নিক সংকেত, স্মৃতি এবং দলগত আচরণের এক বিস্ময়কর সমন্বয়।

মানুষ মূলত চোখের মাধ্যমে পৃথিবীকে উপলব্ধি করে। কিন্তু পিঁপড়েদের ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই আলাদা। তাদের জগৎ গড়ে উঠেছে রাসায়নিক সংকেতের ওপর। যেখানে আমরা একটি সাধারণ রান্নাঘর দেখি, সেখানে পিঁপড়েরা অসংখ্য রাসায়নিক তথ্যের উপস্থিতি অনুভব করে।

পিঁপড়েদের মাথার সামনে থাকা অ্যান্টেনা বা শুঁড় তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল অঙ্গ। এই অ্যান্টেনা দিয়ে তারা মেঝে, দেয়াল এবং আশপাশের পরিবেশ স্পর্শ করে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত করতে পারে। মানুষের নাক যেসব গন্ধ বুঝতে পারে না, পিঁপড়েরা সেসব ক্ষুদ্র সংকেতও সহজেই ধরতে সক্ষম।

এ কারণে মেঝেতে পড়ে থাকা চিনির কয়েকটি দানা, ফলের রসের সামান্য অংশ কিংবা মিষ্টিজাতীয় খাবারের অতি ক্ষুদ্র কণাও তাদের নজর এড়ায় না।

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে পিঁপড়েদের ঘ্রাণশক্তি নিয়ে গবেষণা করছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, পিঁপড়েদের জিনোমে গন্ধ শনাক্ত করার জন্য বিশেষ ধরনের বিপুলসংখ্যক জিন রয়েছে।

২০১২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় জানা যায়, অনেক অন্যান্য কীটপতঙ্গের তুলনায় পিঁপড়েদের শরীরে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি ঘ্রাণ রিসেপ্টর বিদ্যমান। এই রিসেপ্টরগুলো তাদের পরিবেশে উপস্থিত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

ফলে মানুষ যেখানে কেবল একটি খাবারের টুকরো দেখে, সেখানে পিঁপড়েরা সেই খাবারের রাসায়নিক পরিচয়ও বুঝতে পারে। বিশেষ করে চিনি, মধু, ফলের রস বা অন্যান্য মিষ্টিজাতীয় খাদ্য তাদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

পিঁপড়েদের খাদ্যাভ্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মিষ্টি জাতীয় খাবার। কারণ এসব খাদ্যে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা তাদের শক্তির প্রধান উৎস।

প্রকৃতিতে পিঁপড়েরা ফুলের মধুরস, ফলের রস, গাছের নির্গত মিষ্টি তরল এবং অন্যান্য চিনিযুক্ত পদার্থ খেয়ে থাকে। একটি কলোনিতে হাজার হাজার পিঁপড়ে বাস করে। এত বড় একটি সমাজকে সচল রাখতে নিয়মিত শক্তির প্রয়োজন হয়। তাই তারা স্বাভাবিকভাবেই মিষ্টি খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

মানুষের ঘরে থাকা চিনি, গুড়, মিষ্টি, বিস্কুট, কেক কিংবা সফট ড্রিংকসের অবশিষ্টাংশ তাদের কাছে সহজলভ্য শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।

পিঁপড়েদের সমাজে সব সদস্য একই কাজ করে না। খাদ্য অনুসন্ধানের জন্য কিছু বিশেষ কর্মী পিঁপড়ে থাকে, যাদের অনেক গবেষক “স্কাউট” বা অনুসন্ধানকারী পিঁপড়ে বলে থাকেন।

এই পিঁপড়েরা কলোনি থেকে বেরিয়ে আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করে। তারা দেয়ালের ফাঁক, মেঝের কোণা, জানালার ধারে কিংবা রান্নাঘরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়। তাদের কাজ হলো নতুন খাদ্য উৎস খুঁজে বের করা।

যখন কোনো স্কাউট পিঁপড়ে খাবারের সন্ধান পায়, তখন সে শুধু নিজে খাবার খেয়ে ফিরে আসে না। বরং সে পুরো কলোনিকে সেই খাদ্যের খবর পৌঁছে দেয়।

পিঁপড়েরা শুধুমাত্র গন্ধের ওপর নির্ভরশীল নয়। পিপড়ের শরীরে থাকে বিশেষ ধরনের স্বাদগ্রাহক বা টেস্ট রিসেপ্টরও ।

গবেষণায় দেখা গেছে, পিঁপড়েদের অ্যান্টেনা এবং সামনের পায়ে এমন কিছু সংবেদনশীল রিসেপ্টর থাকে, যা চিনির অতি ক্ষুদ্র কণাও শনাক্ত করতে পারে।

অনেক সময় মিষ্টি খাবারের গন্ধ বাতাসে খুব বেশি ছড়ায় না। সেক্ষেত্রে পিঁপড়েরা খাবারের কাছাকাছি এসে সরাসরি স্পর্শের মাধ্যমে তার উপস্থিতি বুঝতে পারে।

এ কারণেই রান্নাঘরের কাউন্টারে লেগে থাকা সামান্য সিরাপ, চামচে শুকিয়ে থাকা চায়ের দাগ কিংবা মেঝেতে পড়ে থাকা ক্ষুদ্র চিনির কণাও তাদের নজরে আসে।

পিঁপড়েদের খাদ্য অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হলো ফেরোমোন।

ফেরোমোন হচ্ছে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ, যা প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করে। পিঁপড়েরা এই রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে একে অপরকে তথ্য পাঠায়।

যখন একটি পিঁপড়ে খাদ্যের সন্ধান পায়, তখন সে কলোনিতে ফেরার পথে মাটিতে ফেরোমোনের একটি রাস্তা তৈরি করে। এই রাস্তা অন্য পিঁপড়েদের জন্য নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।

পরবর্তীতে অন্য পিঁপড়েরা সেই রাসায়নিক পথ অনুসরণ করে সরাসরি খাদ্যের উৎসে পৌঁছে যায়। অনেক গবেষক এই ব্যবস্থাকে আধুনিক জিপিএস বা নেভিগেশন সিস্টেমের সঙ্গে তুলনা করেন।

আমরা সাধারণত দেখি, পিঁপড়েরা একটি লাইনে চলাচল করে। কারণটা হলো ফেরোমোন।

প্রথম পিঁপড়ে খাবার খুঁজে পাওয়ার পর যে রাসায়নিক পথ তৈরি করে, অন্য পিঁপড়েরা সেটি অনুসরণ করে। এরপর তারাও একই পথে চলতে চলতে নতুন করে ফেরোমোন ছড়ায়।

ফলে রাসায়নিক পথটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যত বেশি পিঁপড়ে সেই পথ ব্যবহার করে, তত বেশি ফেরোমোন জমা হয়। এর ফলে পুরো কলোনি একই পথ অনুসরণ করতে শুরু করে।

এভাবেই খাবারের উৎস এবং বাসার মধ্যে একটি স্থায়ী রাস্তা তৈরি হয়।

পিঁপড়েদের সমাজে কোনো কেন্দ্রীয় নেতা নেই, তবুও তারা অত্যন্ত সংগঠিতভাবে কাজ করে।

ধরা যাক, দুটি ভিন্ন পথ দিয়ে একই খাবারের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। প্রথমে কিছু পিঁপড়ে এক পথ ব্যবহার করবে, অন্যরা অন্য পথ ব্যবহার করবে। কিন্তু যে পথটি ছোট এবং দ্রুত, সেখানে যাতায়াত বেশি হবে এবং বেশি ফেরোমোন জমা হবে।

ফলে অধিকাংশ পিঁপড়ে ঐ পথই বেছে নেবে। এটা তাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, যেটা নির্দেশ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে যায়।

বিজ্ঞানীরা এই আচরণকে “স্ব-সংগঠিত বুদ্ধিমত্তা” বা Self-organized Intelligence হিসেবে বর্ণনা করেন।

এই অঙ্গের মাধ্যমে পিপড়েরা শুধু খাবারের গন্ধই শনাক্ত করে না, বরং অন্য অন্যান্যদের সঙ্গে যোগাযোগও করে তাকে। সঠিক পথ নির্ধারণ ও কলোনির সদস্যদের চিনতে, অ্যান্টেনা ব্যবহৃত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো কারণে অ্যান্টেনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে একটি পিঁপড়ের জন্য স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তখন সে কার্যত তার যোগাযোগ ও নেভিগেশন ক্ষমতার বড় একটি অংশ হারিয়ে ফেলে।

পিঁপড়েরা সাধারণত প্রথমে এলোমেলোভাবে চারপাশে ঘোরাফেরা করে। অনুসন্ধানকারী পিঁপড়েরা বিভিন্ন জায়গা পরীক্ষা করতে থাকে। যখন তাদের কেউ খাবারের সন্ধান পায়, তখন ফেরোমোনের সাহায্যে সেই তথ্য পুরো কলোনিতে পৌঁছে যায়।

অর্থাৎ, একটি পিঁপড়ে হঠাৎ করে দূর থেকে খাবারের অবস্থান জেনে যায় না। বরং অসংখ্য অনুসন্ধানকারী পিঁপড়ের নিরন্তর খোঁজাখুঁজির ফলেই খাদ্যের উৎস আবিষ্কৃত হয়।

পিঁপড়েদের আচরণ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বারবার বিস্মিত হয়েছেন। মাত্র কয়েক মিলিমিটার আকারের একটি প্রাণী এমন দক্ষতার সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ধারণার সঙ্গে মিলে যায়।

রাসায়নিক সংকেত ব্যবহার করে পথ তৈরি করা, দলগতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া, খাদ্যের অবস্থান শেয়ার করা এবং কাজ ভাগ করে নেওয়ার মতো বৈশিষ্ট্য তাদেরকে পৃথিবীর অন্যতম সফল সামাজিক প্রাণীতে পরিণত করেছে।