সাবেক পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক ও আইনি তৎপরতা আরও জোরদার হয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য বিনিময়ের কাজও এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে দুবাইয়ে তার জামিনের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেছে সরকার।
রোববার রাজধানী ঢাকা এবং রাজশাহীতে পৃথক দুটি অনুষ্ঠানে সরকারের দুই দায়িত্বশীল মন্ত্রী এ বিষয়ে বক্তব্য দেন। তাদের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে, অভিযুক্ত সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার কূটনৈতিক আলোচনা, আইনি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের মধ্যে এ বিষয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদান-প্রদান হয়েছে এবং ইউএই কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সরকারের কাছে কয়েকটি নির্দিষ্ট তথ্য চেয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রস্তুত করে ইউএই সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। এখন সেই তথ্য পর্যালোচনার পর পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে খুব শিগগিরই বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতে জামিন পেয়েছেন। এই বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অন্য দেশের আদালতের সিদ্ধান্ত সে দেশের নিজস্ব আইনি কাঠামোর অধীন। তবে বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো বিদেশি আদালতের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব আইনগত অবস্থান তুলে ধরবে এবং দুই দেশের আইনি সহযোগিতার সুযোগগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে।
বেনজীর আহমেদের জামিন নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকেও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। পুলিশের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেন, জামিন সংক্রান্ত যেসব তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে, সেগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক বা নিশ্চিত তথ্য এখন পর্যন্ত পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে পৌঁছায়নি।
তিনি বলেন, সরকারিভাবে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
এদিকে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি জানান, বেনজীর আহমেদের জামিনের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পরপরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। এ বিষয়ে তিনি স্বরাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে তাৎক্ষণিক আলোচনা করেন এবং পরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কয়েকদিন আগেই দুবাইয়ে একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের মূল দায়িত্ব হচ্ছে স্থানীয় আদালতে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং জামিন বাতিলের জন্য প্রয়োজনীয় আবেদন ও যুক্তি উপস্থাপন করা।
তার মতে, বিদেশের আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়েই পরিচালিত হয়। ফলে বাংলাদেশ সরকারও একইভাবে আইনসম্মত পদ্ধতিতেই বিষয়টি এগিয়ে নিতে চায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বেনজীর আহমেদকে কিছু নির্দিষ্ট শর্তে জামিন দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে সেই শর্তগুলো কী এবং আদালতের আদেশে ঠিক কী উল্লেখ রয়েছে, তা জানতে সংশ্লিষ্ট আদালতের প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, আদালতের নথি হাতে পাওয়ার পর আইনজীবীরা বিষয়টি বিশ্লেষণ করবেন এবং জামিন বাতিলের আবেদন করার মতো আইনি ভিত্তি থাকলে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক আলোচনা, আইনি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং দুই দেশের প্রশাসনিক সহযোগিতা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন হয়। ফলে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় লাগলেও সরকার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে দেখছে।
চলতি বছরের জুন মাসে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে এবং তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
সেই সময়ও সরকার জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন বিধান এবং রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার ভিত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এর আগে দায়িত্বশীল আইন কর্মকর্তারাও জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ বিভিন্ন নথি সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছেও পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতের অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে একাধিক মামলার তদন্ত চলছে। বিভিন্ন সংস্থা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচারিক কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করা হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার হবে। একইভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সাংবিধানিক অধিকারও নিশ্চিত করা হবে।
আইন ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে সীমান্ত অতিক্রম করে অপরাধ তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কোনো ব্যক্তি অন্য দেশে অবস্থান করলে তাকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন হয় আদালতের আদেশ, কূটনৈতিক যোগাযোগ, তথ্য বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে চলার।
তাদের মতে, বাংলাদেশ যে কূটনৈতিক ও আইনি দুই ধরনের উদ্যোগ একসঙ্গে গ্রহণ করেছে, তা আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সরকারি কর্মকর্তারা আশা করছেন, চলমান যোগাযোগ ও আইনি প্রক্রিয়ার ইতিবাচক অগ্রগতি হলে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার পথ আরও সুগম হবে। একই সঙ্গে দুবাইয়ে নিয়োজিত আইনজীবী প্রতিষ্ঠান আদালতে প্রয়োজনীয় আবেদন ও আইনি যুক্তি তুলে ধরবে।
তবে তারা এটিও উল্লেখ করেছেন যে, বিদেশের আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের সময়সীমা সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়। ফলে পুরো বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ার গতির ওপরও নির্ভর করবে।

