রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের প্রথম পর্যায়ের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বাংলাদেশ পুলিশ কোনও রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাকারী বাহিনী নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পুলিশের একমাত্র পরিচয় হবে সংবিধান, আইন এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও মানবিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে এবং নতুন কর্মকর্তাদের সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
রবিবার সকালে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া নবীন সহকারী পুলিশ সুপারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণের আস্থা অর্জনই হবে তাদের প্রধান দায়িত্ব। ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করার কোনও সুযোগ নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাধারণ মানুষ যখন থানায় বা পুলিশের কাছে কোনও সেবা নিতে যাবেন, তখন তিনি যেন হয়রানি, ভোগান্তি বা অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখোমুখি না হন। প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে সেবামূলক মনোভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস বাড়বে তখনই, যখন পলিশ নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারবে। এবং সকলের সাথে সমান আচরণ করবে। দল বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, বরং আইন ও সংবিধানের আলোকে দায়িত্ব পালন করাই হবে একজন পুলিশ কর্মকর্তার প্রকৃত পরিচয়।
ক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, পুলিশ বাহিনীতে দুর্নীতির কোনও স্থান নেই। তিনি নবীন কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলেন, পেশাগত জীবনে সততা, জবাবদিহি এবং নৈতিকতার সঙ্গে কখনও আপস করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মতো পুলিশও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি প্রতিষ্ঠান। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে প্রত্যেক সদস্যকে কাজ করতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, তথ্য চুরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে। এসব অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশ সদস্যদের আধুনিক প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
তিনি বলেন, কেবল প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দক্ষতা নয়, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল ফরেনসিক, সাইবার নিরাপত্তা এবং আধুনিক তদন্ত পদ্ধতিতেও দক্ষতা বাড়াতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত সক্ষমতাই সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে হবে। একজন অসহায় মানুষ যখন পুলিশের দ্বারস্থ হন, তখন তিনি ন্যায়বিচার ও সহযোগিতার প্রত্যাশা করেন। সেই প্রত্যাশা পূরণ করা প্রতিটি পুলিশ সদস্যের নৈতিক দায়িত্ব।
তিনি বলেন, পুলিশের কাজ শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার করা নয়; বরং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নাগরিকদের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা সৃষ্টি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, অতীতের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পুলিশ বাহিনী নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে একটি আরও পেশাদার, নিরপেক্ষ এবং জনগণকেন্দ্রিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, বিগত সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করাই বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় দায়িত্ব।
দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই কর্মকর্তারা শৃঙ্খলা, সততা এবং পেশাদারিত্ব বজায় রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন।
তিনি আরও বলেন, চেইন অব কমান্ড মেনে দায়িত্ব পালন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে এই নতুন কর্মকর্তারা কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
সমাপনী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের প্রথম পর্যায়ের ছয় মাসব্যাপী মৌলিক প্রশিক্ষণ। ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী ৫৮ জন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার সফলভাবে প্রশিক্ষণ শেষ করে মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত হন।
এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা শারীরিক সক্ষমতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, আইন সম্পর্কে জ্ঞান, তদন্ত কৌশল, অস্ত্র পরিচালনা, ফিল্ড অপারেশন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা লাভ করেন।
বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত সমাপনী কুচকাওয়াজে প্রশিক্ষণার্থীরা শৃঙ্খলা, দক্ষতা এবং পেশাদারিত্বের পরিচয় দেন। প্রধান অতিথি হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কুচকাওয়াজের অভিবাদন গ্রহণ করেন এবং পরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেরা পারফরম্যান্স দেখানো কর্মকর্তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা প্রশিক্ষণার্থীদের নিখুঁত কুচকাওয়াজ এবং পেশাদার উপস্থাপনার প্রশংসা করেন।
এবারের প্রশিক্ষণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জনকারী কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা হয়। সহকারী পুলিশ সুপার ড. মো. নূরুল হুদা ভূঁইয়া প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন। পাশাপাশি ‘বেস্ট প্রবেশনার’ এবং ‘বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ’ দুইটি সম্মাননা অর্জন করেন।
এছাড়া ‘বেস্ট একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার আবু নুমান মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম। অস্ত্র পরিচালনায় সর্বোচ্চ দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ‘বেস্ট শ্যুটার’ নির্বাচিত হন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ এ বি এম মামুন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির এবং বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপ্যাল অ্যাডিশনাল আইজিপি জি এম আজিজুর রহমান।
তারা নবীন কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সততা, নিষ্ঠা এবং পেশাদারিত্বের বিকল্প নেই। জনগণের সেবা নিশ্চিত করাই হবে একজন পুলিশ কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
অনুষ্ঠিতে বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ের পুলিশিং শুধু অপরাধ দমনেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, সাইবার নিরাপত্তা, মানবাধিকার সুরক্ষা, কমিউনিটি পুলিশিং এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি কার্যকর আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও একই বার্তা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গঠনে একটি দক্ষ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী অপরিহার্য। নতুন কর্মকর্তাদের পেশাগত জীবনের প্রতিটি ধাপে সততা, মানবিকতা ও আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।
সমাপনী কুচকাওয়াজের মাধ্যমে নতুন এই কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক কর্মজীবনের সূচনা হলো। এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জনগণের আস্থা অর্জন, আইনকে সমানভাবে প্রয়োগ করা এবং একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখা।

