খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে যশোরে কৃষক মুক্তি সংগ্রামের অবস্থান কর্মসূচি

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় পরিবেশ ও জনজীবন সংকট হিসেবে পরিচিত ভবদহের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে আগামীকাল (৩ আগস্ট) যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে...
Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে যশোরে কৃষক মুক্তি সংগ্রামের অবস্থান কর্মসূচি

ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে যশোরে কৃষক মুক্তি সংগ্রামের অবস্থান কর্মসূচি

সমস্যাটি কোনো সাময়িক বা মৌসুমি সংকট নয়। এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীন পানি ব্যবস্থাপনা, নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন না হওয়ার ফল

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় পরিবেশ ও জনজীবন সংকট হিসেবে পরিচিত ভবদহের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে আগামীকাল (৩ আগস্ট) যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে অবস্থান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিতব্য এ কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে কৃষক মুক্তি সংগ্রাম, নড়াইল–যশোর শাখা। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বছরের পর বছর ধরে চলমান পানি নিষ্কাশন সংকট, কৃষিজমির ক্ষতি এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি নতুন করে প্রশাসন ও সরকারের দৃষ্টিগোচর করতেই এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

সংগঠনের নেতারা জানান, ভবদহ এলাকার মানুষ বহু বছর ধরে একই সমস্যার মধ্যে বসবাস করছেন। বর্ষা মৌসুম এলেই বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। ফসলি জমি দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় কৃষকরা সময়মতো চাষাবাদ করতে পারেন না। শুধু কৃষিই নয়, বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক, বাজার এবং স্থানীয় অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক পরিবার বছরের পর বছর জলাবদ্ধতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত।

কৃষক মুক্তি সংগ্রামের মতে, সমস্যাটি কোনো সাময়িক বা মৌসুমি সংকট নয়। এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীন পানি ব্যবস্থাপনা, নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন না হওয়ার ফল। তারা মনে করেন, কেবল নতুন প্রকল্প ঘোষণা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

সংগঠনটির দাবি, ভবদহ অঞ্চলে পানি নিষ্কাশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত আমডাঙা খালের জরুরি সংস্কার এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে খালটির বিভিন্ন স্থানে পলি জমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানীয়দের মতে, খালটি যথাযথভাবে পুনঃখনন ও সংস্কার করা গেলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসতে পারে।

এছাড়া খরনিয়া সেতুর নিকট নির্মিত আড়বাঁধ এবং পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এমন অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় কাঠামো দ্রুত অপসারণেরও দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনের নেতাদের ভাষ্য, এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পুরো ভবদহ অঞ্চলের ওপর পড়ছে।

কর্মসূচির অন্যতম দাবির মধ্যে রয়েছে বিলে বিলে কার্যকরভাবে টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) বাস্তবায়ন।

বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে পরিকল্পিত টিআরএম ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরছেন। কৃষক মুক্তি সংগ্রামের দাবি, বিজ্ঞানসম্মত ও অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে টিআরএম বাস্তবায়ন করা গেলে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে, পলি ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে।

সংগঠনটি আরও বলছে, নদী, খাল ও বিলের প্রাকৃতিক সংযোগ পুনরুদ্ধার না করলে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিভিন্ন স্থানে অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা এবং অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেও অনেক এলাকা পানিতে ডুবে যায় এবং সেই পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকে।

কৃষক মুক্তি সংগ্রামের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। বিশেষ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যক্রম নিয়ে সংগঠনটি প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগের পরিবর্তে প্রকল্পনির্ভর কর্মকাণ্ড এবং প্রশাসনিক জটিলতা সমস্যাকে আরও দীর্ঘায়িত করেছে।

সংগঠনের নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও সেগুলোর কাঙ্ক্ষিত সুফল সাধারণ মানুষ পায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও পানি নিষ্কাশনের পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। ফলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, কিছু প্রভাবশালী মহলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট তৎপরতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবও ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে নানা ধরনের তদবির, মতবিরোধ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে তারা মনে করেন।

এদিকে ভবদহ অঞ্চলের কৃষকদের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বছরের পর বছর ফসল নষ্ট হওয়ায় অনেক কৃষক ঋণের বোঝা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। সময়মতো ধান, পাট, শাকসবজি কিংবা অন্যান্য মৌসুমি ফসল উৎপাদন করতে না পারায় তাদের আয় কমে গেছে। কৃষিনির্ভর অসংখ্য পরিবার বিকল্প জীবিকার সন্ধানে অন্য এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

জলাবদ্ধতার প্রভাব শুধু কৃষিক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকায় বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হয় এবং নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। শিশুদের স্কুলে যাতায়াত ব্যাহত হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতির মুখে পড়ে। এসব কারণে ভবদহ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে।

সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই সংকটের বিষয়টি জাতীয়ভাবে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ এটি কেবল একটি এলাকার সমস্যা নয়; বরং কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু।

আগামীকালের অবস্থান কর্মসূচিকে ঘিরে সংগঠনটি যশোরের সকল সাংবাদিক, সংবাদকর্মী এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, গণমাধ্যমই পারে ভবদহের বাস্তব চিত্র দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে এবং দীর্ঘদিনের এই সংকট সমাধানে জনমত গড়ে তুলতে।

সংগঠনের নেতারা মনে করেন, সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের দৃষ্টি আরও কার্যকরভাবে আকর্ষণ করা সম্ভব হবে। তারা বলেন, এটি শুধু একটি রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কর্মসূচি নয়; বরং হাজারো কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং পানিবন্দি পরিবারের জীবনসংগ্রামের প্রতিফলন।

তারা আরও জানান, অবস্থান কর্মসূচিতে ভবদহ এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সচেতন নাগরিকরা অংশ নেবেন। কর্মসূচি থেকে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে দাবি জানানো হয়েছে, ভবদহ সমস্যাকে আর বিলম্ব না করে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। নদী-খাল পুনরুদ্ধার, কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পিত টিআরএম বাস্তবায়ন এবং অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা অপসারণের মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে তারা সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ভবদহের মানুষের দুর্ভোগকে সামনে এনে দায়িত্বশীল জনমত সৃষ্টি করা গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ আরও সুগম হবে। তাদের প্রত্যাশা, আগামীকালের অবস্থান কর্মসূচি ভবদহ ইস্যুতে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্যোগী হবে।