বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর তিনি একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি) সাউথ এশিয়ার উদ্যোগে আগামী ৫ আগস্ট একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে শেখ হাসিনা অডিও সংযোগের মাধ্যমে অংশ নেবেন বলে জানানো হয়েছে।
এই সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ভারত সরকার এ বিষয়ে কোনো ধরনের বাধা দিচ্ছে কি না, সে প্রশ্নের জবাবে এফসিসি সাউথ এশিয়ার সভাপতি ড. ওয়ায়েল আউয়াদ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকতার নীতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আপত্তি বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়নি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই হবে শেখ হাসিনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বক্তব্য। জানা গেছে, তিনি সরাসরি মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন না। পরিবর্তে অডিও লিংকের মাধ্যমে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখবেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, নিজের রাজনৈতিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশে ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে পারেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ারও সুযোগ থাকবে।
এফসিসি সাউথ এশিয়া বলছে, এটি কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ নয়; বরং একটি সাংবাদিকতাভিত্তিক অনুষ্ঠান। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সাংবাদিকদের সামনে একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ করে দেওয়াই এই আয়োজনের উদ্দেশ্য।
ড. ওয়ায়েল আউয়াদের ভাষ্য অনুযায়ী, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মত ও অবস্থানের ব্যক্তিদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া একটি আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠনের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। সেই নীতির ভিত্তিতেই শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে মামলা কিংবা আদালতের রায় থাকলেও সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে তার বক্তব্য শোনার অধিকার গণমাধ্যমের রয়েছে। এ কারণেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
ড. আউয়াদ সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার বিষয়টি তাদের জানা রয়েছে। তবে একটি আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন হিসেবে তারা বিচারিক বিষয়ের পরিবর্তে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তার মতে, সংবাদমাধ্যমের অন্যতম দায়িত্ব হলো বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য জনগণের সামনে তুলে ধরা। সেই নীতি অনুসরণ করেই এই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোনো রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং তথ্যের আদান-প্রদান এবং সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ সৃষ্টি করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
সংবাদ সম্মেলনে ড. ওয়ায়েল আউয়াদ জানান, কেবল শেখ হাসিনাকেই নয়, বাংলাদেশের বর্তমান প্রতিনিধিদেরও সমানভাবে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি থেকে একাধিকবার ভারতের বাংলাদেশ হাই কমিশনারকে এফসিসিতে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে এখন পর্যন্ত তিনি সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেননি।
তিনি বলেন, সংগঠনটি সব পক্ষকে সমান গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যদি বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করতেন, তাহলে সাংবাদিকরা তাদের কাছ থেকেও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারতেন।
এফসিসি সাউথ এশিয়ার সভাপতি বলেন, তাদের সংগঠন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পক্ষ নেয় না। বরং সাংবাদিকদের জন্য একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।
তিনি জানান, বিভিন্ন দেশের সরকার, বিরোধী দল, কূটনীতিক, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকদের নিয়মিত বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই শেখ হাসিনার এই ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
ড. আউয়াদ আরও বলেন, কোনো বক্তাকে আমন্ত্রণ জানানো মানেই তার বক্তব্য বা রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করা নয়। এটি কেবল সংবাদ সংগ্রহ এবং মতপ্রকাশের একটি সুযোগ।
এই আয়োজন নিয়ে ভারত সরকারের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এফসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারত সরকারের কোনো দপ্তর অনুষ্ঠানটি বন্ধ করার চেষ্টা করেনি কিংবা কোনো ধরনের বাধা দেয়নি।
ড. ওয়ায়েল আউয়াদ বলেন, ভারতের গণতান্ত্রিক পরিবেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে সাংবাদিকদের জন্য এমন একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করতে প্রশাসনিক কোনো বাধার মুখোমুখি হতে হয়নি।
তিনি আরও জানান, অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ সাংবাদিকতাভিত্তিক হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও কোনো আপত্তি জানানো হয়নি।
ভারতের গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির মথুরা রোডে অবস্থিত স্যার মার্ক টালি অডিটোরিয়ামে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
অনুষ্ঠানটি সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুরু হয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা চলবে। শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা।
অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক সাংবাদিক, গবেষক এবং পর্যবেক্ষকরা অংশ নিতে পারবেন। পাশাপাশি অনলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকেও সাংবাদিকরা যুক্ত হয়ে প্রশ্ন করতে পারবেন।
এফসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি শুধু বক্তব্য দেওয়ার অনুষ্ঠান হবে না। শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ফলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, দেশে ফেরার সম্ভাবনা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেবেন, যা এই অনুষ্ঠানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলবে।
শেখ হাসিনার এই ভার্চুয়াল উপস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে ইতোমধ্যেই নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের সময়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অনুষ্ঠানটি নিয়ে আগ্রহ আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তিনি যদি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা কিংবা দেশে ফেরার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা দেন, তাহলে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে তার বক্তব্য বিদেশি কূটনৈতিক মহলেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকায় অনুষ্ঠানটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক গুরুত্ব পাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নিয়ে কাজ করা বহু সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এফসিসি সাউথ এশিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা নিবন্ধন করছেন।
তাদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে তার বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ড. ওয়ায়েল আউয়াদ তার বক্তব্যে বিশেষভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বিভিন্ন মত ও অবস্থানের মানুষের বক্তব্য শোনার সুযোগ থাকা উচিত।
তার মতে, সাংবাদিকদের কাজ হলো সব পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরা এবং জনগণকে তথ্য জানানো। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করা নয়।
তিনি আরও বলেন, এফসিসি ভবিষ্যতেও একই নীতিতে কাজ করবে এবং প্রয়োজন হলে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, বিরোধী নেতা কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও একইভাবে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেবে। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে ও দৈনিক ওয়াদা

