বিশ্বকাপে দুর্দান্ত সূচনার পর বড় প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নেমেছিল স্কটল্যান্ড। কিন্তু মরক্কোর বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ১-০ গোলের পরাজয় তাদের সমর্থকদের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। বোস্টনে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে স্কটিশ ফুটবলপ্রেমীরা আশা করেছিলেন অন্তত একটি পয়েন্ট অর্জন করে নকআউট পর্বের পথে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে দলটি। তবে ম্যাচের শুরুতেই মরক্কোর দ্রুত গোল সেই পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দেয়।
খেলা শুরুর মাত্র দুই মিনিটের মাথায় মরক্কোর মিডফিল্ডার ইসমাইল সাইবারি গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। এই গোল স্কটল্যান্ডকে পুরো ম্যাচজুড়ে চাপে ফেলে দেয়। প্রথমার্ধে স্টিভ ক্লার্কের শিষ্যরা নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয় এবং মরক্কোর আক্রমণ সামলাতেই ব্যস্ত থাকে।
মরক্কোর সংগঠিত রক্ষণভাগ ও দ্রুত পাল্টা আক্রমণের সামনে স্কটল্যান্ডের খেলোয়াড়রা বারবার সমস্যায় পড়ে। ফলে প্রথমার্ধে উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি করাও কঠিন হয়ে ওঠে।
বিরতির পর স্কটল্যান্ড অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামে। দলটি বলের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় এবং মরক্কোর রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। কয়েকটি সম্ভাবনাময় আক্রমণও তৈরি হয়।
তবে ম্যাচের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত ছিল একটি সম্ভাব্য পেনাল্টির ঘটনা। স্কটিশ সমর্থক এবং বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, তাদের দল একটি পরিষ্কার পেনাল্টি পাওয়ার দাবিদার ছিল। কিন্তু রেফারির সিদ্ধান্ত তাদের পক্ষে যায়নি। শেষ পর্যন্ত গোলের দেখা না পাওয়ায় ১-০ ব্যবধানে হার মেনে নিতে হয় স্কটল্যান্ডকে।
মরক্কোর বিপক্ষে পরাজয়ের পর শুধু মাঠেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা স্কটল্যান্ড সমর্থকদের মাঝেও হতাশা নেমে আসে। গ্লাসগোর ওভিও হাইড্রোতে আয়োজিত অফিসিয়াল ওয়াচ পার্টিতে হাজারো সমর্থক ম্যাচ দেখছিলেন। অনেকের জন্য শেষ মুহূর্তগুলো দেখা ছিল কষ্টকর।
অন্যদিকে বোস্টনের স্টেডিয়ামে উপস্থিত সমর্থকদের মুখেও উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মরক্কোর গোলের পর থেকেই তারা চিন্তিত হয়ে পড়েন। তবুও ম্যাচের পুরো ৯০ মিনিট জুড়ে তারা দলকে সমর্থন দিয়ে গেছেন এবং দারুণ পরিবেশ বজায় রেখেছেন।
ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো সমর্থক এক মিনিট করতালির মাধ্যমে ডনি স্ট্র্যাথিকে স্মরণ করেন। তিনি স্কটল্যান্ডের একজন ভ্রমণকারী সমর্থক ছিলেন, যিনি হাইতির বিপক্ষে ম্যাচের পর বোস্টনে মৃত্যুবরণ করেন।
এই মুহূর্তটি পুরো স্টেডিয়ামকে আবেগপ্রবণ করে তোলে এবং ফুটবলের বাইরেও সমর্থকদের ঐক্যের একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়।
বিশ্বকাপ চলাকালে স্কটল্যান্ডের সমর্থকরা বোস্টনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। তাদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি, গান, স্লোগান এবং উদযাপন স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
স্থানীয় বার ও রেস্তোরাঁগুলোর মালিকরাও স্কটিশ সমর্থকদের কারণে ব্যবসায়িক সাফল্যের কথা জানিয়েছেন। বোস্টনের একটি জনপ্রিয় বারের পরিচালনাকারী ডেভন স্যাভেজ জানান, কয়েক দিনের মধ্যে স্কটিশ সমর্থকেরা সাধারণ সময়ের তুলনায় চার গুণ বেশি বোস্টন লেগার পান করেছেন।
চাহিদা এতটাই বেড়ে যায় যে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হয়। মাত্র এক সপ্তাহান্তে তিন হাজারের বেশি পাইন্ট লেগার বিক্রি হয় এবং অসংখ্য খালি কেগ সংগ্রহ করতে হয়।
হাইতির বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে জয়ের পর স্কটল্যান্ডজুড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ ছুটির দিন ঘোষণা করা হয় এবং সমর্থকেরা গভীর রাত পর্যন্ত উদযাপন চালিয়ে যান।
রাস্তাজুড়ে শোনা যায় বিখ্যাত স্লোগান—“নো স্কটল্যান্ড, নো পার্টি”। দেশের বিভিন্ন শহরে আনন্দ মিছিল ও উদযাপনের দৃশ্য ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্কটিশ সংগীত তারকা Rod Stewart-সহ অনেক পরিচিত মুখ স্টেডিয়ামে উপস্থিত থেকে দলকে সমর্থন জানান। এছাড়া John Swinney স্কটল্যান্ডের সাফল্যকে “ঐতিহাসিক” এবং “ভূমিকম্পসদৃশ” মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন।
তার মতে, এই বিশ্বকাপ অভিযান স্কটল্যান্ডকে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে এবং গোটা দেশকে একত্রিত করেছে।
বিশ্বকাপের পাশাপাশি বোস্টনের বিখ্যাত Fenway Park-এও স্কটিশ সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা গ্যালারি ও করিডোরজুড়ে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন।
“দ্য ফ্লাওয়ার অব স্কটল্যান্ড” এবং “সুপার জন ম্যাকগিন” গানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। এমনকি স্থানীয় বেসবল সমর্থকেরাও স্বীকার করেন, বহু বছরের মধ্যে এত প্রাণবন্ত পরিবেশ তারা দেখেননি।
এখন স্কটল্যান্ডের সামনে রয়েছে আরেকটি কঠিন পরীক্ষা। তাদের শেষ গ্রুপ ম্যাচে প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। যদিও ব্রাজিলকে শক্তিশালী ফেবারিট হিসেবে ধরা হচ্ছে, তবুও স্কটল্যান্ডের সামনে সুযোগ রয়েছে নিজেদের ভাগ্য বদলে দেওয়ার।
ব্রাজিলের তারকা Neymar চোটের কারণে এখনও পুরোপুরি ফিট নন। ফলে ব্রাজিল কিছুটা দুর্বল অবস্থায় মাঠে নামতে পারে। স্কটল্যান্ড এই সুযোগ কাজে লাগানোর আশা করছে।
মরক্কোর বিপক্ষে হারের ফলে স্কটল্যান্ডের পথ কঠিন হয়ে গেছে, তবে তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। উদ্বোধনী ম্যাচে জয় পাওয়ার কারণে তারা এখনও সেরা তৃতীয় স্থানধারী দলগুলোর একটি হিসেবে নকআউট পর্বে পৌঁছানোর সুযোগ ধরে রেখেছে।
তাই ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচটি শুধু আরেকটি গ্রুপ ম্যাচ নয়, বরং স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপ ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই। সমর্থকেরা আশা করছেন, দলটি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে এবং তাদের স্বপ্নকে জীবিত রাখবে।
মরক্কোর কাছে ১-০ গোলের পরাজয় স্কটল্যান্ডের জন্য অবশ্যই হতাশাজনক। তবে পুরো টুর্নামেন্টে দলটির লড়াকু মানসিকতা এবং সমর্থকদের অবিশ্বাস্য সমর্থন এখনও তাদের বড় শক্তি। বিশ্বকাপের মঞ্চে স্কটল্যান্ড নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে, আর সেই স্বপ্নের পরবর্তী অধ্যায় লেখা হবে ব্রাজিলের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে। সমর্থকদের বিশ্বাস, টার্টান আর্মির গল্প এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

