হার্টেও হতে পারে ক্যানসার! লক্ষণ, কারণ, ঝুঁকি ও চিকিৎসা নিয়ে চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা
মানুষ সাধারণত ক্যানসার বলতে ফুসফুস, লিভার, কিডনি বা স্তনের ক্যানসারের কথাই বেশি শোনেন। কিন্তু অনেকেরই অজানা, হৃদ্যন্ত্রেও ক্যানসার হতে পারে। যদিও এই রোগ অত্যন্ত বিরল, তবু এটি ভয়ঙ্কর এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা রাখে। চিকিৎসকদের মতে, হার্ট ক্যানসারের লক্ষণ অনেক সময় হার্ট অ্যাটাক বা সাধারণ হৃদ্রোগের মতো হওয়ায় রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়। আর সেই কারণেই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
বর্তমানে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাবার, ধূমপান, মদ্যপান ও মানসিক চাপের কারণে নানা জটিল রোগের মতো বিরল ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ছে। হার্ট ক্যানসারও সেই তালিকায় উঠে এসেছে নতুন করে আলোচনায়।
হার্টে ক্যানসার কীভাবে হয়?
হৃদ্যন্ত্র মানুষের শরীরের সবচেয়ে কর্মক্ষম অঙ্গগুলোর একটি। এটি সারাক্ষণ সংকুচিত ও প্রসারিত হয়ে শরীরের প্রতিটি অংশে রক্ত পৌঁছে দেয়। এত সক্রিয় অঙ্গে ক্যানসার হওয়া সত্যিই বিরল ঘটনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, হার্টের কোষ খুব কম বিভাজিত হয় বলেই সেখানে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে কম।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ০.১ শতাংশেরও কম মানুষ প্রাইমারি হার্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হন। তবে রোগটি বিরল হলেও একেবারে অসম্ভব নয়।
হার্টে সাধারণত দুই ধরনের ক্যানসার দেখা যায়— প্রাইমারি হার্ট ক্যানসার এবং সেকেন্ডারি হার্ট ক্যানসার।
প্রাইমারি হার্ট ক্যানসার কী?
যখন হৃদ্যন্ত্রের নিজস্ব কোষ বা টিস্যুতে ক্যানসার তৈরি হয়, তখন তাকে প্রাইমারি হার্ট ক্যানসার বলা হয়। এই অবস্থায় হার্টের কোষ অস্বাভাবিকভাবে বিভাজিত হতে শুরু করে এবং টিউমার তৈরি হয়।
এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ধরন হলো কার্ডিয়াক অ্যাঞ্জিয়োসারকোমা। এটি এক ধরনের ম্যালিগন্যান্ট টিউমার, যা সাধারণত হৃদ্যন্ত্রের রক্তনালি বা লিম্ফ টিস্যুতে তৈরি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি হার্টের ডান অলিন্দে দেখা যায়।
সমস্যা হলো, এই টিউমার খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। হার্টের অন্যান্য অংশ আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি রক্তের মাধ্যমে ফুসফুস, মস্তিষ্কসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও ক্যানসার ছড়িয়ে যেতে পারে।
সেকেন্ডারি হার্ট ক্যানসার কেন হয়?
সব ক্ষেত্রে হার্টে সরাসরি ক্যানসার তৈরি হয় না। অনেক সময় শরীরের অন্য কোথাও হওয়া ক্যানসার পরে হৃদ্যন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে। একে বলা হয় সেকেন্ডারি বা মেটাস্ট্যাটিক কার্ডিয়াক টিউমার।
বিশেষ করে ফুসফুসের ক্যানসার, স্তন ক্যানসার, রক্তের ক্যানসার কিংবা কিডনির ক্যানসার থেকে হার্টে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই ধরনের ক্যানসার তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
হার্ট ক্যানসারের লক্ষণ কী কী?
হার্ট ক্যানসারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এর প্রাথমিক লক্ষণ সহজে বোঝা যায় না। অনেক রোগী প্রথম দিকে সাধারণ দুর্বলতা বা হার্টের সামান্য সমস্যার মতো উপসর্গ অনুভব করেন। ফলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়।
টিউমার বড় হতে থাকলে রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি হয় এবং তখন বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে।
যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে:
• অল্প কাজেই হাঁপিয়ে যাওয়া
• শ্বাসকষ্ট হওয়া
• বুক ধড়ফড় করা
• বুকে চাপ বা ব্যথা অনুভব হওয়া
• ঘুমের সময় শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার মতো অনুভূতি
• অতিরিক্ত রাতের ঘাম
• দুর্বলতা ও ক্লান্তি
• হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া
• পা, গোড়ালি বা পেটে পানি জমে ফুলে যাওয়া
এই লক্ষণগুলোর অনেকটাই হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ফেইলিউরের মতো। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বিষয়টি বোঝা কঠিন।
কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?
চিকিৎসাবিজ্ঞান এখনও নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি ঠিক কী কারণে হার্ট ক্যানসার হয়। তবে কয়েকটি বিষয়কে ঝুঁকির কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
যেমন—
• দীর্ঘদিন ধূমপান ও মাদকাসক্তি
• অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ
• অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
• স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন
• দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ
• জিনগত ত্রুটি বা পারিবারিক ইতিহাস
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেলে বিরল ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
কীভাবে ধরা পড়ে হার্ট ক্যানসার?
হার্ট ক্যানসার শনাক্ত করা সহজ নয়। কারণ সাধারণ ইসিজি বা প্রাথমিক পরীক্ষায় সব সময় এটি ধরা পড়ে না।
চিকিৎসকেরা সাধারণত কয়েকটি আধুনিক পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করেন। যেমন—
• ইকোকার্ডিওগ্রাম
• এমআরআই
• সিটি স্ক্যান
• বায়োপসি
• পিইটি স্ক্যান
এসব পরীক্ষার মাধ্যমে হার্টের ভেতরে টিউমার আছে কি না এবং তা কতটা ছড়িয়েছে, তা বোঝা যায়।
হার্ট ক্যানসারের চিকিৎসা কতটা জটিল?
হৃদ্যন্ত্র অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ হওয়ায় এখানে ক্যানসারের চিকিৎসা বেশ কঠিন। টিউমারের অবস্থান ও আকার অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।
চিকিৎসার মধ্যে থাকতে পারে—
অস্ত্রোপচার
যদি টিউমার সীমিত আকারে থাকে, তাহলে অপারেশনের মাধ্যমে তা সরানোর চেষ্টা করা হয়। তবে সব ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার সম্ভব হয় না।
রেডিয়েশন থেরাপি
উচ্চ ক্ষমতার রশ্মি ব্যবহার করে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা হয়। কিন্তু এতে সুস্থ হৃদ্কোষেরও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কেমোথেরাপি
ওষুধের মাধ্যমে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি কমানোর চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় রেডিয়েশনের সঙ্গে কেমোথেরাপিও দেওয়া হয়।
টার্গেটেড থেরাপি
নতুন কিছু চিকিৎসা পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করে ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলক কম হতে পারে।
দ্রুত শনাক্ত করা কেন জরুরি?
হার্ট ক্যানসার সাধারণত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই রোগ যত দ্রুত ধরা পড়বে, চিকিৎসার সুযোগও তত বেশি থাকবে। দেরিতে ধরা পড়লে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় বা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো সমস্যা থাকলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সচেতন জীবনযাপন অনেক জটিল রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
সুস্থ থাকতে কী করবেন?
হার্ট ক্যানসার বিরল হলেও সুস্থ জীবনযাপন হৃদ্যন্ত্রকে ভালো রাখতে বড় ভূমিকা রাখে।
• ধূমপান ও মাদক এড়িয়ে চলুন
• তেল-চর্বিযুক্ত খাবার কম খান
• নিয়মিত হাঁটুন বা ব্যায়াম করুন
• পর্যাপ্ত ঘুমান
• মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন
• বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন
হার্ট শুধু শরীরের একটি অঙ্গ নয়, এটি পুরো জীবনের চালিকাশক্তি। তাই ছোট কোনো উপসর্গকেও অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

