মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে আবারও সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। দেশটির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রত্যাবাসনের আগে প্রত্যেক শরণার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং যদি কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা বা মানবাধিকার হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তাকে জোরপূর্বক মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে না। মানবিক মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সরকার এই নীতি অনুসরণ করবে বলে জানিয়েছে।
সম্প্রতি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফিরিয়ে নিতে সম্মতি দিয়েছে। এই ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, শরণার্থী অধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের আশঙ্কা ছিল, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না করেই যদি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হয়, তাহলে তারা আবারও নির্যাতন, সহিংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হতে পারেন।
এই উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানী কুয়ালালামপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, সরকার কোনোভাবেই এমন সিদ্ধান্ত নেবে না, যা পরে জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়েতে হয় শরণার্থীদের । প্রত্যেকটি বিষয় যাচাই-বাছাই করা হবে প্রত্যাবাসনের । আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত নেবে মালয়েশিয়ার সরকার।
ফাহমি ফাদজিল বলেন, মালয়েশিয়া একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে কখনোই সরে আসবে না। কোনো শরণার্থীকে এমন জায়গায় ফেরত পাঠানো হবে না, যেখানে তার জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে কিংবা নির্যাতনের আশঙ্কা রয়েছে।
তার ভাষায়, প্রত্যাবাসন শুধুমাত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি মানবিক বিষয়ও। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে জোর করে পাঠানোর প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষ করে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর তথ্য ও মূল্যায়নকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। পরিস্থিতি অনুকূল না হলে সরকার বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করবে।
মালয়েশিয়ার সরকার জানিয়েছে, যদিও মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসন কিছু রোহিঙ্গাকে গ্রহণে সম্মতি প্রকাশ করেছে, তবুও শুধু সেই সম্মতির ভিত্তিতে কাউকে ফেরত পাঠানো হবে না।
প্রত্যাবাসনের আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাচাই করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
- সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে কি না।
- মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার পর তার নাগরিক অধিকার রক্ষা করা হবে কি না।
- বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার সুযোগ রয়েছে কি না।
- আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পরিস্থিতিকে নিরাপদ হিসেবে মূল্যায়ন করছে কি না।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বর্তমানে পুরো বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করছে। পর্যালোচনার ফল সন্তোষজনক হলে তবেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মালয়েশিয়ার ঘোষণার পর থেকেই মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়।
সংগঠনগুলোর দাবি, রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত। তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, সহিংসতা এবং দমন-পীড়নের বহু অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে হাজারো মানুষের জীবন আবারও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তারা সরকারকে আরও সময় নিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছে এবং প্রত্যাবাসনের আগে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সম্পৃক্ত করার দাবি তুলেছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় নিবন্ধিত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা দুই লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি।
এর মধ্যে এক লাখ ২৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা, যারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে দেশটিতে আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় রোহিঙ্গা আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত।
এছাড়া আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন, পাকিস্তান এবং আরও কয়েকটি দেশের বাস্তুচ্যুত মানুষও মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন।
সম্প্রতি কুয়ালালামপুরে ইউএনএইচসিআরের কার্যালয়ের সামনে শতাধিক রোহিঙ্গা জড়ো হন। পরে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের আটক করে। তবে তদন্তে দেখা যায়, তাদের অধিকাংশের কাছেই বৈধ নিবন্ধনপত্র ছিল।
পরবর্তীতে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর থেকেই রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় এবং প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্ব পায়।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই ঘটনাই মালয়েশিয়া সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে দেয়, যাতে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মানবিক বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মালয়েশিয়ার প্রধান রোহিঙ্গা অধিকার সংগঠন সরকারের পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
সংগঠনটির মতে, মিয়ানমারে এখনো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। তারা বলছে, প্রত্যাবাসনের আগে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, নাগরিকত্বের অধিকার এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে ফিরলে অনেকেই পুনরায় নির্যাতন, গ্রেপ্তার বা সহিংসতার শিকার হতে পারেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মালয়েশিয়া এখনো ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন কিংবা ১৯৬৭ সালের প্রোটোকলে স্বাক্ষর করেনি।
ফলে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থীদের আইনি মর্যাদা দেয় না। অধিকাংশ শরণার্থী সেখানে ইউএনএইচসিআরের নিবন্ধনের মাধ্যমে সীমিত সুরক্ষা পান।
তবুও দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়া বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ সেখানে বসবাস করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনি স্বীকৃতি না থাকলেও মানবিক বিবেচনায় মালয়েশিয়া বহু বছর ধরে শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে আসছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা নিজ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ওই অভিযানে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।
এরপর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশে আশ্রয় নেন।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা শরণার্থী জনগোষ্ঠীর আশ্রয়দাতা দেশ হলেও মালয়েশিয়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন তখনই সফল হতে পারে, যখন তাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার নিশ্চিত হবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়ে আসছে। কোনো ধরনের জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও তারা মনে করে।
এ কারণে মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক অবস্থানকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। কারণ সরকার স্পষ্ট করেছে যে, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক সমঝোতা নয়, বাস্তব নিরাপত্তা পরিস্থিতিও সমান গুরুত্ব পাবে।

