বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট একটি ভয়াবহ ও রক্তাক্ত দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। সেদিন সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় সংঘটিত হামলায় থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সহ মোট ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে এ ঘটনাটি শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেনি, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং জনরোষের ভয়াবহ রূপও সামনে নিয়ে আসে।
ঘটনার এক বছর পরও সেই দিনের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া পুলিশ সদস্যরা। নিহতদের পরিবার এখনও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের বিচার ও তদন্ত নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
এনায়েতপুর থানার হামলায় বেঁচে যাওয়া পুলিশ সদস্য আব্দুল মালেক এখনও সেই দিনের স্মৃতি ভুলতে পারেননি। তিনি জানান, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে একপর্যায়ে তিনি নিজের বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।
হামলার সময় তিনি তার ছোট ভাইকে ফোন করে বলেছিলেন, থানা আক্রান্ত হয়েছে এবং হয়তো তিনি আর জীবিত ফিরতে পারবেন না। নিজের সন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্বও ভাইয়ের ওপর দিয়ে দেন তিনি। আব্দুল মালেকের ভাষায়, সেটিই ছিল তার জীবনের শেষ কথা বলে মনে হয়েছিল।
যদিও ভাগ্যক্রমে তিনি প্রাণে বেঁচে যান, কিন্তু তার অনেক সহকর্মী সেই সুযোগ পাননি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী, ৪ আগস্ট সকালে কয়েক হাজার আন্দোলনকারী মিছিল নিয়ে এনায়েতপুর থানার সামনে আসে। প্রথম দফায় পুলিশের সঙ্গে কথা বলে তারা ফিরে যায়।
কিন্তু দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। পুনরায় কয়েক হাজার মানুষ থানার সামনে জড়ো হয় এবং একপর্যায়ে থানা ঘেরাও করে হামলা শুরু করে।
পুলিশ সদস্যরা প্রথমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। তারা টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার উদ্যোগ নেন। তবে পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
সংঘর্ষের সময় সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। এরপর জনতার ক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করে এবং থানার ওপর ব্যাপক হামলা শুরু হয়।
হামলার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক ছিল পুলিশ সদস্যদের ওপর চালানো সহিংসতা।
সেদিন থানার ওসিসহ মোট ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে ১৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দুই পুলিশ সদস্য মারা যান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার সময় অনেক পুলিশ সদস্য প্রাণ বাঁচাতে থানার পেছনের দিক দিয়ে পালিয়ে আশপাশের বাড়িঘরে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেও তারা নিরাপদ ছিলেন না।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, হামলাকারীদের একটি অংশ বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের খুঁজে বের করে। অনেককে সেখানেই মারধর করা হয়। এমনকি কয়েকজনকে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগও রয়েছে।
একটি বাড়ির সদস্য জানান, তারা ভয়ে দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতরে লুকিয়ে ছিলেন। সেই বাড়ির বাথরুমে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে বের করে এনে মারধর করা হয়। পরে বাড়ির সামনেই কয়েকজনের মরদেহ একত্র করে রাখা হয়েছিল।
নিহতদের মধ্যে একজন পুলিশ সদস্যের মরদেহ থানার পাশের একটি বাজার এলাকায় গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও জানা যায়, যা ঘটনাটির নির্মমতাকে আরও স্পষ্ট করে।
হামলার সময় থানায় ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। একই সঙ্গে থানার অস্ত্রাগার থেকেও অস্ত্র ও গুলি লুট হয়ে যায়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাইফেল, পিস্তল ও শটগানসহ মোট ১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। ঘটনার এক বছর পরও এসব অস্ত্রের সবগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, এখনও অন্তত ছয়টি অস্ত্র এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার বাকি রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এটি এখনও উদ্বেগের একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এনায়েতপুর থানার হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, নিহতদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী পুলিশ কনস্টেবল ছিলেন।
পরে জানা যায়, তথ্যটি পুরোপুরি সঠিক ছিল না।
হামলার সময় থানায় দায়িত্ব পালনরত এক নারী কনস্টেবল জানান, তিনি তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন না। থানার ছয়জন নারী সদস্যের মধ্যে তিনজন সে সময় মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন।
তিনি বলেন, হামলাকারীদের হাত থেকে তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে গিয়ে এক সহকর্মী কনস্টেবল উপস্থিত লোকজনকে বলেছিলেন যে তার পেটে সন্তান রয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল মানবিক কারণে যেন তাকে আঘাত না করা হয়।
কিন্তু বাস্তবে সেই চেষ্টা খুব একটা কাজে আসেনি।
নারী কনস্টেবল জানান, তাকে মারধর করা হয়েছিল এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। মাথায় সেলাইও দিতে হয়েছিল। একপর্যায়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। পরে সন্ধ্যার দিকে জ্ঞান ফিরলে নিজেকে হাসপাতালে দেখতে পান।
তার ভাষ্যমতে, যিনি তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন সেই কনস্টেবল রবিউল ইসলামও হামলাকারীদের হাতে নিহত হন।
ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ পর, ২৬ আগস্ট এনায়েতপুর থানায় পুলিশ সদস্যদের হত্যার ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের চারজন নেতার নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাত পরিচয়ের পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষকেও আসামি করা হয়।
মামলার এক নম্বর আসামি ছিলেন এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহম্মদ মোস্তফা খান বাচ্চু। পরে তিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা যান।
এ মামলায় সিরাজগঞ্জের আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। তাদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসও ছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এনায়েতপুরের ঘটনায় মোট চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি পুলিশ সদস্যদের হত্যার মামলা এবং বাকি তিনটি আন্দোলনকারীদের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলা।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত এখনও অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হচ্ছে না। অভিযুক্ত ব্যক্তি যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, সে সময়ের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি মামলার গতিপ্রকৃতিতে প্রভাব ফেলেছিল।
এনায়েতপুর থানার পুলিশ হত্যা মামলার বাদী হিসেবে স্বাক্ষর রয়েছে এসআই আব্দুল মালেকের।
তবে তিনি জানিয়েছেন, মামলার এজাহার তিনি নিজে লেখেননি। ঘটনার পর শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিলেন। তাকে শুধু কোথায় স্বাক্ষর করতে হবে তা জানানো হয়েছিল এবং তিনি সেখানে স্বাক্ষর করেন।
অন্যদিকে সে সময় পুলিশের দায়িত্বশীল পদে থাকা এক সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং পুলিশের ওপর থাকা চাপের কারণে দ্রুত মামলা রেকর্ড করতে হয়েছিল।
তার দাবি, তখনকার পরিস্থিতিতে পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত নাজুক অবস্থার মধ্যে ছিল এবং দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিল।
এনায়েতপুর থানার হামলার এক বছর পেরিয়ে গেলেও ঘটনাটি এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। নিহত পুলিশ সদস্যদের পরিবার বিচার প্রত্যাশা করছে। একই সঙ্গে হামলায় নিহত আন্দোলনকারীদের পরিবারও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে।
সেদিনের সহিংসতা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সংঘাত যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তখন তার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষ, আন্দোলনকারী এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদেরও।
এনায়েতপুর থানার ৪ আগস্টের হামলা শুধু একটি থানায় আক্রমণের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সহিংস অধ্যায়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এ ঘটনার অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যাবে। তবে নিহত ১৫ পুলিশ সদস্যের স্মৃতি, বেঁচে ফেরা সদস্যদের বর্ণনা এবং সেই দিনের বিভীষিকা দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানুষের মনে জায়গা করে থাকবে।তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

