প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা অসহায়, তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্প। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যেতে পারে একটি মানুষের পুরো জীবন। কয়েক সেকেন্ডের কম্পনে শুধু ভবন ধসে পড়ে না, ভেঙে যায় স্বপ্ন, পরিবার এবং বেঁচে থাকার শক্তিও।
এবার সেই নির্মম বাস্তবতার শিকার হলেন আর্জেন্টিনার ফুটবলার লুকাস ত্রেহো। স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে হারিয়ে তাঁর জীবন যেন মুহূর্তেই অন্ধকারে ডুবে গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের দীর্ঘ অপেক্ষার পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তাঁর পরিবারের নিথর দেহ।
গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্প দুটির মাত্রা ছিল ৭.২ এবং ৭.৫। প্রচণ্ড কম্পনে রাজধানী কারাকাসসহ আশপাশের বহু এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক বহুতল ভবন ধসে পড়ে এবং হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং বহু মানুষ নিখোঁজ ছিলেন।
৩৮ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন ফুটবলার লুকাস ত্রেহো ভেনেজুয়েলার ক্লাব মারিতিমো দে লা গুয়াইরার হয়ে খেলেন। ভূমিকম্পের সময় তিনি দলের সঙ্গে কারাকাসে অবস্থান করছিলেন। তখনও তিনি বুঝতে পারেননি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে।
কিছুক্ষণ পর তিনি জানতে পারেন যে লা গুয়াইরার প্লায়া গ্রান্দে এলাকায় অবস্থিত তাঁদের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটি ধসে পড়েছে। সেই ভবনের মধ্যেই ছিলেন তাঁর স্ত্রী ইয়ানিনা মারানেল্লা এবং দুই সন্তান অ্যারন ও আইনহোয়া। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি দুর্গত এলাকায় ছুটে যান।
ভূমিকম্পের পর লুকাস ত্রেহো সামাজিক মাধ্যমে অসহায় আবেদন জানিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন যে তাঁর পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই এবং তিনি বিশ্বাস করতে চাইছেন যে তাঁরা হয়তো ভবনের ভেতরে ছিলেন না।
এই বার্তাটি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য মানুষ তাঁর পরিবারের নিরাপদে ফেরার জন্য প্রার্থনা করেন। তাঁর বাবা এবং ভাইও আর্জেন্টিনা থেকে দ্রুত ভেনেজুয়েলায় পৌঁছে উদ্ধারকাজে যোগ দেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশা ক্ষীণ হতে শুরু করে। ঘণ্টা পেরিয়ে দিন, তারপর আরও কয়েকটি রাত কেটে যায়। উদ্ধারকর্মী, সেনাবাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক এবং ফুটবল বিশ্বের অনেক মানুষ একসঙ্গে কাজ করেন।
অবশেষে প্রায় ৭৪ ঘণ্টা অনুসন্ধানের পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় ইয়ানিনা মারানেল্লা, অ্যারন এবং আইনহোয়ার নিথর দেহ। যে আশাটুকু শেষ পর্যন্ত সবাই ধরে রেখেছিলেন, সেটিও সেখানেই শেষ হয়ে যায়।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় শুধু লুকাস ত্রেহোর পরিবার নয়, পুরো ফুটবল বিশ্ব শোকাহত হয়ে পড়েছে। সতীর্থ, প্রতিপক্ষ ফুটবলার এবং সমর্থকেরা সামাজিক মাধ্যমে শোকবার্তা প্রকাশ করেছেন।
লুকাসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ফুটবলার এডসন তোর্তোলেরোও গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এমন কষ্টের সামনে ভাষা অনেক সময় ছোট হয়ে যায়। তাঁর জন্য শক্তি ও সাহস কামনা করেন সবাই।
এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিল যে জীবন কতটা অনিশ্চিত। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে মানুষ নিজের পরিবারকে নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিলেন, তিনি আজ একা হয়ে গেছেন।
ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্প বহু পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কিন্তু লুকাস ত্রেহোর গল্প মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে অন্যভাবে। কারণ এখানে শুধু পরিসংখ্যান নেই, আছে একজন বাবার হারিয়ে যাওয়া হাসি, একজন স্বামীর ভেঙে পড়া পৃথিবী এবং একজন মানুষের অসহনীয় ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি।
একটি ভূমিকম্প শুধু ভবন ধ্বংস করেনি, চিরতরে কেড়ে নিয়েছে একজন ফুটবলারের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান তিনটি মানুষকে।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

