পিতাকে হারানোর শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি লিওনেল মেসি। কিন্তু সেই গভীর ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেই আবার ফুটবল মাঠে ফিরলেন আর্জেন্টিনার মহাতারকা। বাবার মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন পরই ইন্টার মায়ামির জার্সিতে মাঠে দেখা গেল তাঁকে। বুধবার লিগস কাপের ম্যাচে লিওনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন মেসি। তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে আবেগে ভেসে ওঠে গোটা স্টেডিয়াম।
মেসির মাঠে ফেরার খবরটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরও একটি কারণে। বাবার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া দীর্ঘ আবেগঘন বার্তায় ফুটবল নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। সেই পোস্টের পর মেসি দীর্ঘদিনের জন্য ফুটবল থেকে বিরতি নেবেন, এমনকি অবসরের পথেও হাঁটতে পারেন—এমন জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তবে আপাতত সেই আশঙ্কা দূর করে আবারও ফুটবলের কাছেই ফিরেছেন তিনি।
গত শনিবার প্রয়াত হন মেসির বাবা হোর্হে মেসি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ছেলের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। শুধু বাবা হিসেবেই নয়, মেসির পেশাদার ফুটবলজীবনের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন হোর্হে। তিনি দীর্ঘদিন ছেলের এজেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাবার মৃত্যুর পর মেসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ আবেগঘন বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে বাবাকে হারানোর কষ্ট, তাঁদের একসঙ্গে কাটানো সময় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের অনিশ্চয়তার কথা জানান তিনি।
মেসির সেই বার্তা থেকেই স্পষ্ট হয়েছিল, বাবার মৃত্যু তাঁকে কতটা নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপেও বাবার উপস্থিতি নিয়ে তাঁর আবেগঘন স্মৃতির কথা উঠে আসে।
মেসি জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপে খেলার জন্য তাঁর বাবা তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলেন। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর কিছুদিন আগে হোর্হে মেসির শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের সময় মেসির বাবা তাঁর পাশে থাকতে পারেননি।
বাবার মৃত্যুর পর মেসির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টটি ফুটবলবিশ্বে নতুন আলোচনা তৈরি করে। সেখানে তিনি জানান, সামনে আর কতদিন পেশাদার ফুটবল খেলবেন, তা নিয়ে তাঁর মনে বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এর পরেই সমর্থকদের মধ্যে আশঙ্কা দেখা দেয়, হয়তো মেসি এবার ফুটবল থেকে দীর্ঘ বিরতি নিতে পারেন। কেউ কেউ আবার মনে করতে শুরু করেন, মেসির বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় হয়তো খুব কাছেই চলে এসেছে।
তবে মেসি নিজে অবসরের কোনো ঘোষণা দেননি। বরং আবেগঘন সেই বার্তার পর খুব দ্রুতই তাঁকে আবার মাঠে দেখা গেল।
অর্থাৎ আপাতত মেসির অবসর নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলার সুযোগ নেই। তিনি যে এখনও ফুটবল থেকে সরে যাচ্ছেন না, মাঠে ফিরে সেটিই স্পষ্ট করেছেন।
বাবার মৃত্যুর পর বুধবার প্রথমবার ইন্টার মায়ামির হয়ে মাঠে নামেন মেসি। লিগস কাপের ম্যাচে মায়ামির প্রতিপক্ষ ছিল লিওন।
ম্যাচের শুরুতে মেসিকে বেঞ্চে রাখা হয়েছিল। পরে দ্বিতীয়ার্ধে তাঁকে মাঠে নামানো হয়। মেসি মাঠে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই স্টেডিয়ামের পরিবেশ বদলে যায়।
সমর্থকরা দাঁড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। শোকের মধ্যেও প্রিয় তারকাকে মাঠে দেখতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মায়ামির সমর্থকরা। মেসির প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে স্টেডিয়ামে তৈরি হয় বিশেষ আবহ।
মেসির জন্য এটি ছিল নিছক আরেকটি ম্যাচ নয়। ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্যেও তিনি ফুটবলের মাঠে ফিরে এসেছেন।
মেসি মাঠে ফিরলেও ম্যাচের ফল ইন্টার মায়ামির পক্ষে যায়নি।
লিওনের কাছে ৩-২ গোলে হেরে যায় মায়ামি। ফলে মেসির প্রত্যাবর্তনের রাতটি শেষ পর্যন্ত জয়ের আনন্দে পরিণত হয়নি। ম্যাচে লিওনের হয়ে জোড়া গোল করেন দানিয়েল আর্সিলা।
মায়ামির হয়ে গোল করেন দানিয়েল পিন্টার ও ইয়ানিক ব্রাইট। কিন্তু শেষদিকে আর্সিলার গোলেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় লিওন।
ফলে মেসি মাঠে ফিরলেও দলকে জয় এনে দিতে পারেননি। বরং ম্যাচের পর মায়ামির জন্য লিগস কাপের পথও কঠিন হয়ে যায়।
বাবার মৃত্যুর পর এত দ্রুত মাঠে ফেরার সিদ্ধান্তের পেছনে মেসির ব্যক্তিগত মানসিক অবস্থাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ফুটবল তাঁর জীবনের সঙ্গে শৈশব থেকেই জড়িয়ে। তাঁর সাফল্যের প্রতিটি ধাপে বাবা হোর্হে মেসির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ফলে বাবাকে হারানোর পর ফুটবল থেকে দূরে থাকা তাঁর জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে মাঠে ফিরে আসাকে অনেকেই ফুটবলের প্রতি তাঁর গভীর সম্পর্কের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন। তবে মেসি নিজে এই প্রত্যাবর্তনকে কীভাবে দেখছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য এখনও সামনে আসেনি।
তাই এটিকে নিশ্চিতভাবে ‘শোক কাটানোর কৌশল’ বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, ব্যক্তিগত কঠিন সময়ের মধ্যেও তিনি পেশাদার দায়িত্বে ফিরেছেন।
মেসির অবসর নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি অবসরের ঘোষণা দেননি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তায় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ের কথা বললেও তিনি কবে ফুটবল ছাড়বেন, তা বলেননি। মাঠে ফিরে আসাও দেখাচ্ছে যে অন্তত এই মুহূর্তে তিনি খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে মেসির বয়স এখন ৩৯ বছর। তাই তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ সময় নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। বাবার মৃত্যুর পর সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অবসর নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
মেসির সাম্প্রতিক আবেগঘন বার্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিশ্বকাপ প্রসঙ্গ।
হোর্হে মেসি চেয়েছিলেন, তাঁর ছেলে আরও একটি বিশ্বকাপে খেলুন। শারীরিক অবস্থার অবনতি সত্ত্বেও তিনি মেসিকে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন।
মেসিও সেই ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপ চলাকালে বাবাকে পাশে পাননি। মেসির নিজের বক্তব্যে উঠে এসেছে, বড় একটি টুর্নামেন্টে বাবার অনুপস্থিতি তাঁর কাছে ছিল একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা।
এই কারণেই বাবার মৃত্যুর পর মেসির আবেগ আরও গভীর হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
মেসি মাঠে নামার মুহূর্তটি তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের ঘটনা ছিল না। এটি ছিল এক শোকাহত তারকার মাঠে ফিরে আসার মুহূর্ত।
ইন্টার মায়ামির সমর্থকরা দাঁড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই কঠিন সময়ে তাঁরা মেসির পাশে রয়েছেন। মাঠে ফেরার মাধ্যমে মেসিও যেন জানিয়ে দিলেন, ব্যক্তিগত জীবনে যত বড় আঘাতই আসুক, ফুটবল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। মেসি নিজেই জানিয়েছেন, ক্যারিয়ার নিয়ে তাঁর মনে সংশয় রয়েছে। তাই আগামী দিনগুলোতে তিনি কতটা নিয়মিত খেলবেন কিংবা শেষ পর্যন্ত কবে অবসরের সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এই মুহূর্তে অবশ্য একটি বিষয় পরিষ্কার অবসর নেননি মেসি। বরং পিতৃশোকের মধ্যেই আবারও ফুটবল মাঠে ফিরে এসেছেন আর্জেন্টিনার মহাতারকা।

