ঢাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কমেনি। বরং বিভিন্ন সময়ে বিশেষ অভিযান, নিয়মিত অভিযান এবং মামলাভিত্তিক কার্যক্রমে বিপুলসংখ্যক মানুষকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। তারপরও রাজধানীর রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি কিংবা জনবহুল এলাকায় অপরাধের আশঙ্কা পুরোপুরি কাটছে না। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে নগরবাসীর উদ্বেগ এখনো যথেষ্ট। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে এত অভিযান ও গ্রেফতারের পরও কেন ঢাকাকে পুরোপুরি নিরাপদ করা যাচ্ছে না?
২০২৬ সালের একটি আন্তর্জাতিক সূচকও রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বৈশ্বিক তথ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নাম্বিওর ক্রাইম অ্যান্ড সেফটি ইনডেক্সে দক্ষিণ এশিয়ার তালিকাভুক্ত শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অপরাধ সূচক সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ঢাকার ক্রাইম ইনডেক্স ৬২ দশমিক ২ এবং সেফটি ইনডেক্স ৩৭ দশমিক ৮। অর্থাৎ অপরাধের আশঙ্কা ও মানুষের নিরাপত্তাবোধ দুই ক্ষেত্রেই রাজধানী নিয়ে উদ্বেগের জায়গা রয়েছে।
অবশ্য নাম্বিওর সূচককে সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই সূচক মূলত ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা, মতামত ও নিরাপত্তা নিয়ে তাদের উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। একজন মানুষ দিনে বা রাতে একা চলাচল করতে কতটা নিরাপদ বোধ করেন, বাসায় চুরির আশঙ্কা কতটা, ছিনতাই বা ডাকাতির ভয় আছে কি না, মাদক ও সহিংসতা নিয়ে তার অভিজ্ঞতা কেমন এসব বিষয় সূচক তৈরিতে বিবেচনায় আসে। তাই এটি ঢাকার প্রকৃত অপরাধের সরকারি হিসাব নয়, কিন্তু নগরবাসীর নিরাপত্তাবোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র হিসেবে বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় ধরনের অভিযান দেখা গেছে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১ মে থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত ৮৮ দিনের বিশেষ অভিযানে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অভিযোগে ৩৯ হাজার ২৯৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ৮ আগস্ট পর্যন্ত এই সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজারে পৌঁছায়। বিশেষ অভিযানের হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৪৭ জন গ্রেফতার হয়েছেন।
এর বাইরে নিয়মিত মামলা, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেফতার এবং অন্যান্য অপরাধবিরোধী অভিযানে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষকে আটক করা হয়েছে। ফলে শুধু গ্রেফতারের সংখ্যা দেখলে মনে হতে পারে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের কার্যক্রম চলছে। বাস্তবেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নানা এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে এবং বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে।
কিন্তু সমস্যাটি হচ্ছে, গ্রেফতার মানেই অপরাধের মূল উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। একজন ছিনতাইকারী গ্রেফতার হওয়ার পর তার জায়গায় যদি আরেকজন একই কাজে যুক্ত হয়, তাহলে শুধু গ্রেফতারের সংখ্যা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির পরিবর্তন করা কঠিন। একইভাবে একটি চোরাই পণ্য উদ্ধার করা হলেও যদি সেই পণ্য কেনাবেচার বাজার সক্রিয় থাকে, তাহলে নতুন করে চুরি হওয়ার সুযোগ থেকেই যায়।
এ কারণেই অপরাধ বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নয়, অপরাধের পেছনে থাকা পুরো নেটওয়ার্ককে চিহ্নিত করা জরুরি।
রাজধানীতে নিরাপত্তাহীনতার একটি বড় কারণ আবাসিক এলাকায় চুরির ঘটনা। কয়েক দিনের জন্য পরিবার নিয়ে বাইরে যাওয়ার পর বাসায় ফিরে দরজা ভাঙা, আলমারি খোলা এবং মূল্যবান জিনিসপত্র না পাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই এখন আর অচেনা নয়।
মগবাজারের সোনালীবাগের বাসিন্দা রতনের ঘটনাটিই এর একটি উদাহরণ। অসুস্থ মাকে দেখতে স্ত্রী ও সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পটুয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে যান। ২৪ জুলাই সকালে বাসায় তালা লাগিয়ে বের হওয়ার পর ২৭ জুলাই গভীর রাতে ঢাকায় ফিরে দেখেন, দরজায় আগের তালা নেই।
কেয়ারটেকার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান, আলমারি ও ড্রয়ার খোলা। ঘরের কাপড়চোপড় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পুরো বাসার চেহারাই বদলে গেছে। পরে তিনি জানতে পারেন, আলমারিতে রাখা প্রায় তিন ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা নেই।
রতনের ধারণা, বাসা কয়েক দিন খালি থাকার সুযোগ নিয়েই চোরেরা তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকেছে। এ ঘটনায় তিনি হাতিরঝিল থানায় মামলা করেন। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে।
এ ধরনের ঘটনা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাঝেমধ্যেই সামনে আসে। ফলে বাইরে যাওয়ার সময় অনেক পরিবারকে এখন শুধু দরজা-জানালা বন্ধ করলেই নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছে না। বাসা খালি আছে এই তথ্য কারও কাছে পৌঁছে গেলে সেটিই কখনো কখনো অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।
শুধু বাসাবাড়ি নয়, রাজধানীর রাস্তাঘাটেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কোথাও পথচারীর কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, কোথাও মোটরসাইকেলে এসে ব্যাগ বা মূল্যবান জিনিস কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ছিনতাইকারীরা বাধা পেলে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করছে। আবার কোথাও আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখিয়ে টাকা বা মালামাল নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় একটি সাধারণ ছিনতাইয়ের ঘটনাও ভয়াবহ পরিণতি তৈরি করছে। ভুক্তভোগী প্রতিরোধ করতে গেলে হামলার শিকার হচ্ছেন। কখনো গুরুতর আহত হচ্ছেন, আবার কোনো ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
আগে রাজধানীতে গভীর রাত বা ভোরের সময়কে তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হতো। কিন্তু অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এখন অনেক এলাকায় অপরাধের সময়ের সেই পুরোনো সীমারেখা আর স্পষ্ট নেই। দিনের ব্যস্ত সময়েও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে মানুষের মধ্যে একটি স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের পরিসংখ্যানও রাজধানীতে চুরির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের কারণ দেখাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন থানায় ৮৪১টি চুরির মামলা হয়েছে।
মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ১৪৩টি, ফেব্রুয়ারিতে ১২৬টি, মার্চে ১৬১টি, এপ্রিলে ১৪৪টি, মে মাসে ১২৩টি এবং জুনে ১৪৪টি চুরির মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
এই হিসাব করলে ছয় মাসে প্রতিদিন গড়ে চারটির বেশি চুরির মামলা থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। তবে থানায় নথিভুক্ত মামলাই যে রাজধানীতে সংঘটিত সব চুরির পূর্ণ চিত্র, এমনটি বলা যায় না।
কারণ অনেক ভুক্তভোগী মামলা করতে চান না। মোবাইল ফোন, সামান্য টাকা কিংবা ছোটখাটো জিনিস চুরি বা ছিনতাই হলে অনেকে থানায় যাওয়ার ঝামেলা এড়িয়ে যান। কেউ কেউ মনে করেন, উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা কম। আবার কেউ আইনি প্রক্রিয়াকে সময়সাপেক্ষ মনে করে অভিযোগই করেন না।
ফলে সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরে আরও কিছু ঘটনা থেকে যেতে পারে। এই বিষয়টি অপরাধ পরিস্থিতি বিশ্লেষণের সময় বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ঢাকায় ১১০টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। জানুয়ারিতে ১৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৫টি, মার্চে ২২টি, এপ্রিলে ১৬টি, মে মাসে ১৮টি এবং জুনে ২৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়।
একই সময়ে রাজধানীতে ডাকাতির ২৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে আটটি, ফেব্রুয়ারিতে তিনটি, মার্চে পাঁচটি, এপ্রিলে তিনটি এবং মে ও জুনে দুটি করে ডাকাতির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
এর বাইরে মাদক, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনাও রয়েছে। এসব অপরাধ একে অন্যের সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পর্কিত হতে পারে। যেমন মাদক ব্যবসার সঙ্গে অর্থের প্রবাহ, অপরাধী চক্র, অবৈধ অস্ত্র এবং স্থানীয় আধিপত্যের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।
নাম্বিওর ২০২৬ সালের ক্রাইম অ্যান্ড সেফটি ইনডেক্সে দক্ষিণ এশিয়ার তালিকাভুক্ত শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার ক্রাইম ইনডেক্স ৬২ দশমিক ২ এবং সেফটি ইনডেক্স ৩৭ দশমিক ৮। তালিকায় দিল্লি, গাজিয়াবাদ, করাচি, কলম্বো, লাহোর ও কাঠমান্ডুর অবস্থান ঢাকার চেয়ে ভালো দেখানো হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। নাম্বিওর তথ্য সরকারি অপরাধের হিসাব নয়। মানুষের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়ায় এই সূচক মূলত একটি শহরের নিরাপত্তা নিয়ে জনমনের ধারণা তুলে ধরে।
তারপরও সূচকটি পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ একটি শহরে মানুষ যদি রাস্তায় হাঁটার সময় বারবার পেছনে তাকান, রাতে একা চলতে ভয় পান, বাসা ফাঁকা রেখে গেলে চুরির চিন্তায় থাকেন কিংবা মোবাইল ফোন হাতে রাস্তায় বের হওয়ার সময় সতর্ক থাকেন, তাহলে সেই শহরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, রাজধানীর চুরি ও ছিনতাইকে আগের মতো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অপরাধকে ঘিরে সংঘবদ্ধ চক্র তৈরি হয়েছে। এসব চক্রের সদস্যদের হাতে দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রও থাকতে পারে এবং তারা অপরাধের বিভিন্ন কৌশলও রপ্ত করছে।
তার মতে, চুরি-ছিনতাইকে ছোট বা সহজে জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ একটি ছিনতাইয়ের সময় ভুক্তভোগী প্রতিরোধ করলে পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে উঠতে পারে।
মাদকাসক্তির বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কেউ অপরাধে যুক্ত হলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে থাকে না; এর সঙ্গে একটি বড় সামাজিক ও অপরাধী নেটওয়ার্ক যুক্ত হয়ে যেতে পারে।
তাই বারবার একই ধরনের অপরাধে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, অপরাধের নেটওয়ার্ক শনাক্ত এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মতো পদক্ষেপও জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম রাজধানীর অপরাধ পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বেকারত্ব, আবাসন সংকট, মাদক এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র একসঙ্গে রাজধানীর পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
ঢাকা প্রতিদিনই নতুন মানুষের আগমন দেখছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ কাজের সন্ধানে রাজধানীতে আসছেন। কিন্তু সবার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান বা বাসস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে না। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা একটি অংশ অপরাধী চক্রের প্রলোভন বা প্রভাবের মধ্যে পড়তে পারে।
এখানে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় কমিউনিটি এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের সময়মতো চিহ্নিত করতে না পারে, তাহলে তাদের একটি অংশ অপরাধী চক্রের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অপরাধীদের পেছনে যদি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুরক্ষা থাকে, তাহলে শুধু নিচের স্তরের সদস্যদের গ্রেফতার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তাই অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, অস্ত্র ও মাদক সরবরাহকারী এবং পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ বলছে, রাজধানীর অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গণির ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, বর্তমানে রাজধানীতে অপরাধের হার কমছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অপরাধীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি ঘটনার তদন্তেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি ও অপহরণের মতো গুরুতর মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করার জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায়, শুধু মামলা গ্রহণ নয়, মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াও দ্রুত করার প্রয়োজনীয়তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্বীকার করছে।
মূল প্রশ্নটি এখানেই অপরাধী গ্রেফতার হওয়ার পরও যদি একই ধরনের অপরাধ আবার ঘটে, তাহলে সমস্যাটি কোথায়?
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু অপরাধীর দিকে তাকালে হবে না। অপরাধের পেছনের অর্থনৈতিক কাঠামো, মাদক সরবরাহ, অবৈধ অস্ত্রের উৎস, চোরাই পণ্যের বাজার এবং অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়গুলোও দেখতে হবে।
চোরাই মোবাইল বা পণ্য যদি সহজেই বিক্রি করা যায়, তাহলে চুরি বা ছিনতাইয়ের বাজার টিকে থাকবে। অবৈধ অস্ত্র সহজলভ্য থাকলে সাধারণ ছিনতাইও ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। মাদকের বাজার সক্রিয় থাকলে নতুন অপরাধী তৈরির ঝুঁকিও থেকে যায়।
একই সঙ্গে বারবার অপরাধে জড়ানো ব্যক্তিদের বিষয়ে কার্যকর নজরদারি, আইনি প্রক্রিয়ার দ্রুততা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা দরকার। সুবিধাবঞ্চিত ও মাদকাসক্তদের জন্য প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকলে তারা আবারও অপরাধে ফিরে যেতে পারে।
ঢাকাকে নিরাপদ করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিকল্পনাও দরকার। মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহ বন্ধ করা, চোরাই পণ্যের বাজার ভেঙে দেওয়া, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের মূল নেতৃত্ব শনাক্ত করা এবং অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা সবকিছু একসঙ্গে করতে হবে।
পাশাপাশি নগরীর আলো, সিসিটিভি, নিরাপদ গণপরিবহন, জননিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। কোনো এলাকায় বারবার একই ধরনের অপরাধ হলে সেখানে আলাদা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
কারণ একটি শহরকে নিরাপদ করার অর্থ শুধু থানায় মামলা কমে যাওয়া নয়। মানুষ যেন রাতে বাড়ি ফিরতে ভয় না পান, বাসা কয়েক দিনের জন্য ফাঁকা রেখে গেলে দুশ্চিন্তায় না থাকেন, সন্তান রাস্তায় বের হলে আতঙ্কে অপেক্ষা না করেন সেই পরিবেশ তৈরি করাই আসল লক্ষ্য।
তথ্য সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

