যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বা ‘বার্থরাইট সিটিজেনশিপ’ সীমিত করার চেষ্টা আবারও আইনি বাধার মুখে পড়তে পারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ব্যাপারে বিস্তৃত অধিকার বহাল রাখার পরও নতুন করে দুটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন ট্রাম্প। এর একটি সরাসরি ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা সন্তানের জন্মের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসা বিদেশিদের লক্ষ্য করে।
তবে আইন বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপও আদালতে টিকবে না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া শিশুর নাগরিকত্ব নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ইতোমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প দুটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্যে একটি আদেশে ফেডারেল সংস্থাগুলোকে এমন কিছু শিশুর নাগরিকত্ব স্বীকৃতি না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাদের বাবা-মায়ের কেউ নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে মনে করা হবে।
অন্য আদেশটির লক্ষ্য আরও সরাসরি। সেখানে বার্থ ট্যুরিজমের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে পারেন—এমন বিদেশিদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে এখানেই তৈরি হয়েছে বড় আইনি প্রশ্ন। কারণ, বর্তমানে মার্কিন নিয়মেই অস্থায়ী ভিসা ব্যবহার করে নবজাতকের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ। ফলে নতুন নির্বাহী আদেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক আমান্ডা ফ্রস্টের মতে, বাবা-মায়ের কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ড শিশুর জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়ার কারণেই এসব শিশু নাগরিকত্বের অধিকার পায়—এটাই মূল বিষয়।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার বিষয়ে ট্রাম্পের আগের উদ্যোগকে সুপ্রিম কোর্টের জুনের রায় বড় ধাক্কা দেয়।
‘ট্রাম্প বনাম বারবারা’ মামলায় আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের আগের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। মামলাটির কেন্দ্রে ছিল মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া এবং দেশটির আইনি কর্তৃত্বের আওতাভুক্ত ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস রায়ে নাগরিকত্বের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া মানুষের জন্য যে নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটিই আজও কার্যকর।
এই রায়ের পরও ট্রাম্প নতুন করে একই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—নতুন আদেশ কি আগের রায়ের সীমা অতিক্রম করছে?
সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ে সব বিচারপতি একমত ছিলেন না। রক্ষণশীল বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো ভিন্নমত পোষণ করেন।
আলিটোর মতে, আদালতের সিদ্ধান্ত এতটাই বিস্তৃত যে এর আওতায় এমন শিশুও পড়বে, যার মা শুধুমাত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে অল্প সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এর ফলে বৈধভাবে অভিবাসনের জন্য অপেক্ষা করা বিদেশিদের তুলনায় ‘বার্থ ট্যুরিস্ট’ পরিবারের সন্তানরা বিশেষ সুবিধা পেয়ে যাবে। তাঁর মতে, বিষয়টি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সংখ্যার দিক থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা বার্থ ট্যুরিজমের সঙ্গে যুক্ত শিশুর সংখ্যা অনেক বেশি বলে দাবি করলেও পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের একটি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিবছর আনুমানিক ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার শিশুর জন্ম এই ধরনের ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করা ট্রাম্পের নতুন কোনো পরিকল্পনা নয়। অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবে তিনি বহু বছর ধরেই এ বিষয়ে পরিবর্তনের কথা বলে আসছেন।
দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেই ট্রাম্প একটি বিস্তৃত নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে থাকা অভিবাসীদের পাশাপাশি বৈধভাবে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করা কিছু বিদেশির সন্তানদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
এর মধ্যে কর্মসংস্থানের ভিসায় থাকা ব্যক্তি এবং শিক্ষার্থীরাও আলোচনায় আসে।
তবে আদালতের রায়ে সেই নীতির বড় অংশ বাধাগ্রস্ত হয়। এখন নতুন আদেশের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন কোন কোন ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের ব্যতিক্রম তৈরি করতে পারে, সেটিই হয়ে উঠেছে পরবর্তী আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্র।
ট্রাম্পের নতুন নির্দেশনায় শুধু বার্থ ট্যুরিজম নয়, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ঐতিহাসিক কিছু ব্যতিক্রম আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বর্তমানে কিছু ব্যতিক্রম স্বীকৃত। যেমন বিদেশি কূটনীতিকদের সন্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখল করে থাকা শত্রু বিদেশি বাহিনীর সদস্যদের সন্তানদের ক্ষেত্রে সাধারণ জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
নতুন আদেশে বিদেশি সরকারের কর্মী এবং বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সন্তানদেরও সম্ভাব্য ব্যতিক্রমের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এই অংশ নিয়েই আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ফ্রস্ট মনে করেন, কূটনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন আইনি ভিত্তি পেতে পারে। কিন্তু তার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রের আইনের আওতায় থাকা থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অব্যাহতি থাকতে হবে।
অন্যদিকে সাবেক বুশ প্রশাসনের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক জন ইউ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে থাকা বিদেশি শত্রু শক্তি বা সন্ত্রাসী সংগঠনের সংজ্ঞা বিস্তৃত করার কিছু উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক বৈধতা পেতে পারে।
সব আইন বিশেষজ্ঞ অবশ্য এতটা আশাবাদী নন।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক স্যাম এরম্যান সতর্ক করে বলেছেন, ইতিহাসে এমন উদাহরণ রয়েছে যেখানে বিদেশিদের ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি অভিবাসীদেরও ‘শত্রু বিদেশি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
তাঁর প্রশ্ন, ভবিষ্যতে একই ধরনের বিস্তৃত সংজ্ঞা প্রয়োগ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া তাদের সন্তানদের নাগরিকত্ব নিয়েও কি প্রশ্ন উঠতে পারে?
এখানেই নতুন নির্বাহী আদেশের ভাষা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লস অ্যাঞ্জেলেস শাখার অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ হিরোশি মোটোমুরার মতে, নতুন নীতির কিছু শব্দ ও সংজ্ঞা খুবই নমনীয়।
যেমন ‘শত্রু বিদেশি’ বলতে কাকে বোঝানো হবে, কিংবা কোনো ব্যক্তি ঠিক কোন উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন—এসব বিষয় নির্ধারণে প্রশাসনের হাতে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর ফলে সন্দেহের ভিত্তিতে ভিসা আটকে দেওয়া, প্রবেশে বাধা দেওয়া কিংবা অতিরিক্ত যাচাইয়ের জন্য আবেদন ঝুলিয়ে রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবশ্য নতুন নির্বাহী আদেশ নিয়ে কোনো সাংবিধানিক সমস্যা আছে বলে মনে করছেন না।
হোয়াইট হাউসের স্টাফ সেক্রেটারি উইল শার্ফ বলেছেন, নতুন আদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে না।
কিন্তু জন ইউ এ বিষয়ে ভিন্নমত দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রতারণামূলকভাবে আইন ভঙ্গ করে সন্তান জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করেছেন—এমন বাবা-মায়ের সন্তানকে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব থেকে বাদ দেওয়ার কোনো ব্যতিক্রম সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে দেখা যায় না।
নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির আইন অধ্যাপক র্যাচেল রোজেনব্লুমও ট্রাম্পের নতুন আদেশ নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন। তাঁর ধারণা, আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন ব্যতিক্রমগুলোর বড় অংশ টিকে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।
সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন উদ্যোগ জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে।
একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, বার্থ ট্যুরিজম এবং অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যদিকে অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ বলছেন, বাবা-মায়ের আচরণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুর সাংবিধানিক নাগরিকত্ব বাতিল করা সহজ নয়।
ফলে ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশ কার্যকর হওয়ার আগেই আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আবারও সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এখন মূল প্রশ্ন একটাই—প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা কতটা দূর পর্যন্ত যেতে পারে, আর সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী কতটা শক্তভাবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। সেই উত্তরই আগামী দিনের আইনি লড়াই নির্ধারণ করবে।

