বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে আবারও সক্রিয় হয়েছে প্রকৃতির রুদ্ররূপ। জোড়া ঘূর্ণাবর্ত এবং বর্ষাকালীন অক্ষরেখার সম্মিলিত প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় অংশেই বৃষ্টির দাপট বেড়েছে। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় টানা বৃষ্টি, মেঘলা আকাশ এবং সূর্যের দেখা না মেলায় জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত। আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী অন্তত তিন দিন এই পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প স্থলভাগে প্রবেশ করছে। এর প্রধান কারণ দুটি সক্রিয় ঘূর্ণাবর্ত এবং বর্ষাকালীন অক্ষরেখা। এই আবহাওয়াগত পরিস্থিতির জেরেই দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক দিন ধরেই কোথাও ঝিরঝিরে, কোথাও আবার মুষলধারে বৃষ্টি চলছে। ফলে জল জমা, যানজট এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাতের মতো সমস্যাও দেখা দিয়েছে।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, শুক্রবার দক্ষিণবঙ্গের সাতটি জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই জেলাগুলি হল—
- উত্তর ২৪ পরগনা
- দক্ষিণ ২৪ পরগনা
- পূর্ব মেদিনীপুর
- পশ্চিম মেদিনীপুর
- পুরুলিয়া
- বাঁকুড়া
- পূর্ব বর্ধমান
- পশ্চিম বর্ধমান
এছাড়া দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলাতেও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও শনিবার ভারী বৃষ্টির নির্দিষ্ট কোনও সতর্কতা নেই, তবুও প্রায় সব জেলাতেই রবিবার পর্যন্ত মাঝারি থেকে হালকা বৃষ্টি চলতে পারে।
রবিবার মুর্শিদাবাদ এবং বীরভূম জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই দুই জেলায় জল জমা ও স্থানীয়ভাবে দুর্ভোগের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, সোমবার থেকে দক্ষিণবঙ্গে আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে হাওয়া অফিস। যদিও বিচ্ছিন্নভাবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি চলতে পারে, তবে আপাতত কোনও বড় সতর্কতা জারি করা হয়নি।
রাজধানী কলকাতায় আপাতত অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। তবে শহরজুড়ে রবিবার পর্যন্ত দফায় দফায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে। আকাশ থাকবে মেঘলা এবং দিনের বেশিরভাগ সময়ই সূর্যের দেখা মিলবে না।
এই আবহাওয়ায় দিনের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকবে। ফলে ভ্যাপসা গরমের পরিবর্তে তুলনামূলক আরামদায়ক পরিবেশ বজায় থাকলেও, টানা বৃষ্টির কারণে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জল জমার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গেও বৃষ্টির তীব্রতা বাড়তে চলেছে। শনিবার এবং রবিবার দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহ জেলাতেও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে। এর পাশাপাশি ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে সোমবারের পর উত্তরবঙ্গেও আপাতত কোনও নতুন আবহাওয়া সংক্রান্ত সতর্কতা নেই।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বর্ষাকালীন অক্ষরেখা পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ হয়ে পশ্চিমবঙ্গের দিঘার উপর দিয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এই অক্ষরেখার পাশাপাশি দুটি পৃথক ঘূর্ণাবর্ত সক্রিয় রয়েছে।
প্রথম ঘূর্ণাবর্তটি অবস্থান করছে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন ওড়িশার উত্তরাংশ এবং গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের উপর, যার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ০.৯ কিলোমিটার।
অন্য ঘূর্ণাবর্তটি গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাংশ এবং বাংলাদেশ সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১.৫ থেকে ৫.৮ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই দুই আবহাওয়াগত ব্যবস্থার কারণে বঙ্গোপসাগর থেকে ক্রমাগত আর্দ্রতা প্রবেশ করছে, যা বৃষ্টি ও বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। ফলে আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
টানা বৃষ্টি হলেও আপাতত সমুদ্রে মৎস্যজীবীদের জন্য কোনও বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়নি। অর্থাৎ সমুদ্র বর্তমানে তুলনামূলক স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে। তবে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকায় নিয়মিত সরকারি পূর্বাভাস অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার সকালে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৬.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ০.৩ ডিগ্রি কম। বৃহস্পতিবার শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৮.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩.৪ ডিগ্রি কম।
টানা মেঘলা আকাশ ও বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা কম থাকলেও বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় অস্বস্তি পুরোপুরি কাটছে না।
বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, রবিবার পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গে এবং শনিবার-রবিবার উত্তরবঙ্গে বৃষ্টির প্রকোপ বেশি থাকবে। সোমবার থেকে ধীরে ধীরে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা কমতে পারে। তবে বর্ষাকাল চলায় বিচ্ছিন্নভাবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, ঘূর্ণাবর্তগুলির প্রভাব দুর্বল হতে শুরু করলে এবং বর্ষাকালীন অক্ষরেখার অবস্থান পরিবর্তিত হলে তবেই রাজ্যে বৃষ্টির তীব্রতা কমবে। তাই আগামী কয়েক দিন নাগরিকদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়া জলাবদ্ধ এলাকায় যাতায়াত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

