ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন আলাপ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দুই দেশের শীর্ষ নেতার এই কথোপকথনে পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফোনালাপে পশ্চিম এশিয়ার চলমান অস্থিরতা এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে দুই নেতা মতবিনিময় করেন। সাম্প্রতিক সময়ে অঞ্চলটিতে সংঘাত, নিরাপত্তা সংকট এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বেড়েছে। এমন বাস্তবতায় ভারত ও ইসরায়েলের শীর্ষ পর্যায়ের এই আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ফোনালাপের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ একটি পোস্ট দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে তিনি জানান, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তারা ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যকার বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি পর্যালোচনা করেছেন।
মোদি বলেন, দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কৃষি, উদ্ভাবন, সাইবার নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উভয় নেতা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অর্থনীতি, উদ্ভাবন এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও দুই দেশ নতুন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বর্তমানে পশ্চিম এশিয়া বিশ্বের অন্যতম অস্থিতিশীল অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা, রাজনৈতিক বিরোধ এবং নিরাপত্তা সংকট আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। একদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু ও মোদির এই ফোনালাপ সেই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানেরই একটি অংশ। পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রবাসী ভারতীয়দের সুরক্ষা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এই অঞ্চলের প্রতিটি পরিবর্তন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গত এক দশকে ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, কৃষি প্রযুক্তি, জল ব্যবস্থাপনা, মহাকাশ গবেষণা এবং উচ্চ প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে ইসরায়েল ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। উন্নত প্রযুক্তির বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, নজরদারি ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা প্রযুক্তি সরবরাহে ইসরায়েলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় ইসরায়েলের আধুনিক প্রযুক্তি ভারত বিভিন্ন রাজ্যে সফলভাবে ব্যবহার করছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল সামরিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং উন্নয়নমূলক বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নরেন্দ্র মোদির ইসরায়েল সফর ভারতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছিল। সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি এবং সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হলেও, সফরের সময় নির্বাচন নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছিল।
সফরের অল্প কিছুদিন পরই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ তোলে, এমন একটি সংবেদনশীল সময়ে ইসরায়েল সফর করা কূটনৈতিকভাবে যথাযথ ছিল না।
বিরোধীদের দাবি ছিল, আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারতের আরও সতর্ক অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল। যদিও ভারত সরকার এ ধরনের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে জানায়, সফরটি পূর্বনির্ধারিত ছিল এবং এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়া।
ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক বর্তমানে “স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ” বা বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই অংশীদারত্বের আওতায় দুই দেশ নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, প্রযুক্তি বিনিময় এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কৌশলগত অংশীদারত্ব শুধু প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয় নয়; বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, সাইবার নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়েও যৌথ উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মোদি ও নেতানিয়াহুর সর্বশেষ ফোনালাপ সেই সহযোগিতার ধারাবাহিকতাকেই আরও জোরালো করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে যেখানে একই সঙ্গে ইসরায়েল, ফিলিস্তিন এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
একদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও অন্যান্য আরব দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতাও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই কারণেই পশ্চিম এশিয়ার প্রতিটি সংকট ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মোদির আলোচনা ভারতের বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন দেশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা সবকিছুর ওপর এই অঞ্চলের প্রভাব রয়েছে।
এমন বাস্তবতায় ভারত ও ইসরায়েলের শীর্ষ নেতাদের ফোনালাপ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
মোদি ও নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক আলোচনা শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরিরও ইঙ্গিত বহন করছে। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, কৃষি, সাইবার নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ আরও জোরদার হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ও ইসরায়েল উভয় দেশই নিজেদের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায়। সেই লক্ষ্যেই নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এবং নীতিগত সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে।

