বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে আসন্ন রাষ্ট্রপতি পদে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তা নিয়ে জোর জল্পনা চলছে। রাজনৈতিক মহলের একাধিক সূত্রের দাবি, বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন এই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। যদিও দলীয়ভাবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবু শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় তাঁর নামই সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে। চলতি বছরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। ফলে সংসদে সংখ্যার বিচারে দলটি যাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেবে, তিনিই নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী না দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিএনপির ভেতরে ও বাইরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিন ধরেই একজন অভিজ্ঞ, সংযত ও গ্রহণযোগ্য রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। দলের সংকটময় সময়ে তাঁর নেতৃত্বের ভূমিকাকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে যখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব নানা আইনি ও রাজনৈতিক চাপে ছিল, তখন দেশের অভ্যন্তরে দলকে সংগঠিত রাখা, আন্দোলন পরিচালনা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ছিলেন অন্যতম মুখ্য নেতৃত্ব।
দলের অনেক নেতার মতে, এই দীর্ঘ রাজনৈতিক অবদানকে সম্মান জানাতেই তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের চিন্তা করা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ধারণা, রাষ্ট্রপতি পদে একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ থাকলে সাংবিধানিক সংকটের সময় রাষ্ট্রের জন্য তা ইতিবাচক হতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই পদ বহুবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে—
- সাংবিধানিক সংকটের সময়
- সরকার গঠনের প্রশ্নে
- জাতীয় নির্বাচনকালীন পরিস্থিতিতে
- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রমে
এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অতীতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং ভবিষ্যতেও হতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।
এ কারণেই এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে বিএনপি কেবল আনুষ্ঠানিক পদায়ন হিসেবে নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি ছিল আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকাল।
সেই সময়—
- দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি ছিলেন।
- ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছিলেন।
- অসংখ্য নেতাকর্মী মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখে পড়েন।
এই দীর্ঘ সময়ে মাঠ পর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা, কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন।
দলের অনেক নেতার মতে, এই অবদানই তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার করে তুলেছে।
বিএনপির ভেতরে ভিন্ন মতও রয়েছে।
একটি অংশ মনে করছে, মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করা হলে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হবে।
অন্যদিকে আরেকটি অংশের যুক্তি, সরকার পরিচালনা ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এখনো মির্জা ফখরুলের মতো অভিজ্ঞ নেতার সরাসরি ভূমিকা অত্যন্ত প্রয়োজন।
তাদের মতে, বঙ্গভবনে গেলে সক্রিয় রাজনীতিতে তাঁর অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে যাবে, যা সরকারের জন্য একটি বড় শূন্যতা তৈরি করতে পারে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও রাষ্ট্রপতি পদে আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—
- ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন
- ড. মঈন খান
- নজরুল ইসলাম খান
- ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ
তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় মির্জা ফখরুলের নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, তিনি শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।
সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থী দেওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা দেখছে না জামায়াতে ইসলামী।
দলটির নেতারা জানিয়েছেন, শুধুমাত্র প্রতীকী প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রার্থী দেওয়ার প্রয়োজন তারা মনে করছেন না।
তবে একই সঙ্গে তারা অভিযোগ তুলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পরামর্শ করেনি।
নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে।
তফসিল অনুযায়ী—
- মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন: ১৩ আগস্ট
- মনোনয়ন যাচাই: ১৬ আগস্ট
- প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন: ১৮ আগস্ট
আইন অনুযায়ী, বৈধ প্রার্থী যদি একজনই থাকেন, তাহলে ভোটগ্রহণ ছাড়াই তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।
তবে একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ অধিবেশন না থাকলে স্পিকার প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করতে পারবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা যতই বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে ক্ষমতাসীন বিএনপির সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দলের ভেতরে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভূমিকা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং গ্রহণযোগ্যতার কারণে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত নাম।
তবে আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন ঘোষণার আগে সব আলোচনা এখনো রাজনৈতিক জল্পনার পর্যায়েই রয়েছে। শেষ পর্যন্ত দলীয় নেতৃত্ব কাকে বেছে নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা কে হচ্ছেন।

