বাংলাদেশে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি গঠনের উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া প্রকাশের পর প্রশ্ন উঠেছে, নাম ও কাঠামো বদলের বাইরে নতুন এই বাহিনীতে আসলে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত খসড়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রস্তাবিত এসআরবিকে একটি বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার, সাইবার অপরাধ দমন, মানবপাচার, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে এই বাহিনীকে।
তবে মানবাধিকারকর্মীদের একটি অংশ মনে করছে, প্রস্তাবিত এসআরবির সঙ্গে বর্তমান র্যাবের মৌলিক পার্থক্য খুব বেশি নেই। অন্যদিকে পুলিশ ও অপরাধবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, নতুন আইনে জবাবদিহি, নাগরিকের অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং তদন্তের মতো কিছু নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, এসআরবি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন কিংবা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে ইউনিটটি গঠন করা হবে।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট শর্ত মেনে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরও এসআরবিতে প্রেষণে নিয়োগ বা সাময়িকভাবে সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আইনের খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে এসব মতামতের ভিত্তিতে খসড়ায় সংশোধন আনা হবে। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে এটি বিল হিসেবে জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
সংসদে বিলটি পাস হয়ে আইনে পরিণত হলে সেই আইনের ভিত্তিতেই র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
প্রস্তাবিত আইনে এসআরবিকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের গুরুতর অপরাধ মোকাবিলার দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং মাদকদ্রব্য উদ্ধারের মতো কার্যক্রম। পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, মানবপাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমনের দায়িত্বও থাকবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ, পাচার এবং মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া গুম, খুন ও ভূমিদস্যুতার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করাও এসআরবির দায়িত্বের মধ্যে রাখা হয়েছে।
এসআরবির সদস্যদের কিছু ক্ষেত্রে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এসব ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি এবং প্রচলিত আইন মেনে চলতে হবে।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা কোনো আলামত জব্দ করার পর এসআরবির সদস্যদের তা দ্রুত নিকটবর্তী থানায় হস্তান্তর করতে হবে।
অর্থাৎ, এসআরবি নিজস্বভাবে অভিযান পরিচালনা করতে পারলেও গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি বা জব্দ করা আলামত থানার সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় দেওয়ার বিধান রাখা হচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন ইউনিটকে ফৌজদারি অপরাধের তদন্তের ক্ষমতাও দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই জায়গাটিকেই র্যাবের আগের কাঠামোর তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন কিছু বিশেষজ্ঞ।
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, এসআরবি শুধু অভিযান চালানো বা গ্রেফতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। গুরুতর অপরাধের তদন্তও করতে পারবে।
আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনে এসআরবির হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকতে পারে। জব্দ করা মালামাল আদালতের নির্দেশ কিংবা সরকারের নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে।
এ ছাড়া বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের তদন্তের এখতিয়ার মহাপরিচালকের হাতে রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত এসআরবি আইনে নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
কোনো নাগরিক বাহিনীর কোনো কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ করলে সেই অভিযোগ পর্যালোচনা ও প্রতিকারের জন্য কমিটি কাজ করবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউনিটের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক এই কমিটির প্রধান হবেন।
প্রয়োজনে নাগরিকের অভিযোগ বা ক্ষোভের বিষয়ে নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ অনুসন্ধান দল গঠন করে বিভাগীয় পদ্ধতিতে তদন্ত করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
এই ব্যবস্থাকে নতুন আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ জানানোর একটি আনুষ্ঠানিক পথ তৈরি হচ্ছে।
র্যাব ২০০৪ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময় পুলিশের একটি বিশেষ বাহিনী হিসেবে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন অভিযানে কথিত ‘ক্রসফায়ার’ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে বাহিনীটি সমালোচিত হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কয়েকশ মানুষ নিহত হন।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও র্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। কক্সবাজারের টেকনাফে একরামুল হক নিহত হওয়ার ঘটনাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং বাহিনীর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশ প্রশাসন সংস্কার নিয়ে গঠিত একটি কমিটি র্যাব বিলুপ্ত করার সুপারিশ করে। এরপর র্যাবের পরিবর্তে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের আলোচনা আরও জোরালো হয়।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, প্রস্তাবিত এসআরবি অনেকটা পুরোনো র্যাব কাঠামোর নতুন সংস্করণ হতে পারে।
তার যুক্তি হলো, র্যাবের মতোই নতুন বাহিনীতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। অথচ অভ্যন্তরীণ অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে পুলিশের প্রশিক্ষণ ও কাজের ধরন আলাদা।
তার মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু বাহিনীর নাম বা কাঠামো পরিবর্তন করলেই হবে না। বিশেষ করে বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ সায়েন্সের অধ্যাপক ওমর ফারুক মনে করেন, প্রস্তাবিত আইনে কিছু নতুন বিষয় স্পষ্টভাবে যুক্ত হয়েছে।
তার মতে, আগের র্যাবের তুলনায় এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। অভিযোগের প্রতিকারে প্রয়োজন হলে বাহিনীর বাইরের ব্যক্তিদেরও যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
তবে এই জায়গাতেই আরেকটি প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ তদন্তের জন্য বাইরের ব্যক্তিদের যুক্ত করার সিদ্ধান্ত যদি পুরোপুরি বাহিনীর কর্তৃপক্ষের হাতে থাকে, তাহলে সেই তদন্ত কতটা স্বাধীন হবে—এ নিয়ে মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
প্রস্তাবিত আইনটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসআরবির দায়িত্বের বড় একটি অংশ র্যাবের বর্তমান কাজের সঙ্গে মিল রয়েছে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার, সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলা এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার মতো দায়িত্ব নতুন ইউনিটের ওপরও থাকবে।
তবে নতুন আইনে তদন্তের ক্ষমতা, নাগরিক অভিযোগের ব্যবস্থা এবং বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহির মতো বিষয়গুলোকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ কারণে এসআরবি পুরোপুরি নতুন একটি কাঠামো হবে, নাকি র্যাবেরই পরিবর্তিত রূপ হিসেবে কাজ করবে—তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত আইনের ভাষা এবং বাস্তবে এর কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হয় তার ওপর।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসআরবি গঠনের আইনের খসড়া এখনো চূড়ান্ত নয়। বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে মতামত নেওয়ার পাশাপাশি খসড়াটি আরও পরিমার্জনের কাজ চলছে।
অর্থাৎ, বর্তমানে যে খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে সেটিই শেষ কথা নয়। মতামত, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এতে আরও পরিবর্তন আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের উদ্যোগে শুধু একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। নতুন বাহিনীকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে, মানবাধিকার রক্ষায় কী ধরনের সুরক্ষা থাকবে, অভিযোগের তদন্ত কতটা স্বাধীন হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত এসআরবির কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।

