স্মার্টফোন এখন প্রায় সবার হাতেই। কয়েক সেকেন্ডেই ছবি তোলা যায়, ভিডিও করা যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। প্রযুক্তির এই সুবিধা যেমন তথ্য প্রকাশকে সহজ করেছে, তেমনি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়েও তৈরি করেছে নতুন ধরনের ঝুঁকি।
কারও অজান্তে ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তা অন্যের কাছে পাঠানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের অভিযোগ এখন প্রায়ই সামনে আসে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি, অন্তরঙ্গ ভিডিও কিংবা এমন কোনো দৃশ্য অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা হলে ভুক্তভোগীর সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
সম্প্রতি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সহপাঠী ও রুমমেটদের ব্যক্তিগত ছবি অনুমতি ছাড়া তার প্রেমিকের কাছে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় হল প্রশাসন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে এবং বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর এসেছে।
এ ধরনের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ, আদান-প্রদান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কখনও সাধারণ মানুষ, আবার কখনও পরিচিত ব্যক্তি কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যরাও এমন ঘটনার শিকার হয়েছেন।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো, অনুমতি ছাড়া কারও ছবি তুললেই কি সেটি অপরাধ? আর কোনো ছবি বা ভিডিও প্রকাশ কখন ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে?
অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও প্রকাশ কি অপরাধ?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মতে, অনুমতি ছাড়া কারও ছবি বা ভিডিও ধারণ করে সেটি প্রকাশ বা অন্যের কাছে পাঠানোর ঘটনা পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনি অপরাধ হতে পারে।
বিশেষ করে ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া হলে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, মর্যাদা বা সামাজিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অভিযোগের ধরন ও ঘটনার পরিস্থিতি অনুযায়ী পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬, দণ্ডবিধি বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো আইনের বিভিন্ন বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
আইনজীবী ইশরাত হাসানের মতে, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। শুধু প্রকাশ নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ধরনের ছবি বা ভিডিও আদান-প্রদানের ঘটনাও আইনি সমস্যার কারণ হতে পারে।
ছবি তুললেই কি মামলা হতে পারে?
এখানেই বিষয়টি কিছুটা জটিল। আইনজীবীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা এবং সেই ছবি প্রকাশ বা ব্যবহার করা—দুটি বিষয়কে সবসময় একভাবে দেখা যায় না।
কারও ছবি তোলা হয়েছে বলেই প্রতিটি ঘটনায় ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে—এমন সরল নিয়ম নেই। কোথায় ছবি তোলা হয়েছে, কেন তোলা হয়েছে, কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এতে ওই ব্যক্তির কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
উদাহরণ হিসেবে কোনো জনসমাগম, অনুষ্ঠান বা প্রকাশ্য স্থানে ছবি তোলার সময় আশপাশের মানুষের ছবি ফ্রেমে চলে আসতে পারে। কিন্তু সেই ছবিকে এমনভাবে ব্যবহার করা হলে যাতে কারও সম্মানহানি হয়, ব্যক্তিগত জীবন প্রকাশ পায় কিংবা তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়, তখন বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পেতে পারে।
পাবলিক প্লেস মানেই কি ছবি তোলার পূর্ণ স্বাধীনতা?
অনেকের ধারণা, রাস্তাঘাট, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বাসস্টেশন, রেলস্টেশন বা শপিংমলের মতো জায়গা যেহেতু পাবলিক প্লেস, তাই সেখানে যে কারও ছবি বা ভিডিও করা যায়।
আইনজীবীদের মতে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
কোনো জায়গা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হলেই সেখানে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত মুহূর্তও প্রকাশ করার অনুমতি পাওয়া যায় না।
ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি পাবলিক প্লেসে তার পরিচিত বা প্রেমিকের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলছেন। তিনি সেখানে থাকলেও তার সেই কথোপকথন বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার অনুমতি দিয়েছেন—এমনটা ধরে নেওয়া যায় না।
তাই পাবলিক প্লেসে ছবি তোলা হয়েছে বলেই সেই ছবি যেকোনো উদ্দেশ্যে প্রকাশ বা ব্যবহার করা যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়।
মানহানি হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়
কোনো ব্যক্তির ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে মিথ্যা, অপমানজনক কিংবা মানহানিকর বক্তব্য যুক্ত করে প্রকাশ করা হলে বিষয়টি আরও গুরুতর হতে পারে।
আইনজীবীদের মতে, এমন ঘটনায় দণ্ডবিধির মানহানিসংক্রান্ত বিধানসহ অন্যান্য প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
অর্থাৎ, একটি সাধারণ ছবি নিজে অপরাধ না হলেও সেটির সঙ্গে এমন ক্যাপশন, বক্তব্য বা তথ্য যুক্ত করা হলে যা ওই ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে, তখন আইনি প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি পোস্ট করে কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান বা হেয় করার চেষ্টা করলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হতে পারে।
ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দিলে কী হতে পারে?
কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি অনুমতি ছাড়া অন্যের কাছে পাঠানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে।
আইনজীবীদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। ঘটনার ধরন অনুযায়ী সাইবার আইন বা পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের মতো নির্দিষ্ট আইনও প্রযোজ্য হতে পারে।
এ ছাড়া কোনো ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে কাউকে ভয় দেখানো, ব্ল্যাকমেইল করা বা চাপ সৃষ্টি করা হলে সেটিও আলাদা ধরনের অপরাধের প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি বা ভিডিওর ক্ষেত্রেও আইন প্রযোজ্য
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে নতুন একটি সমস্যা তৈরি হয়েছে—এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও।
কোনো ব্যক্তির আসল ছবি ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে আপত্তিকর বা বিভ্রান্তিকর ছবি-ভিডিও তৈরি করে তা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হলে বিষয়টি আরও গুরুতর হতে পারে।
এ ধরনের ঘটনায় শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নয়, সাইবার অপরাধ, হয়রানি, মানহানি বা ব্ল্যাকমেইলের মতো বিষয়ও যুক্ত হতে পারে। তাই কারও ছবি নিয়ে এআই ব্যবহার করে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়াকেও হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
জনস্বার্থে ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে কী হবে?
তবে সব ধরনের অনুমতিহীন ছবি বা ভিডিও প্রকাশকে একইভাবে অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে কোনো ছবি বা ভিডিও যদি গুরুতর অপরাধ, দুর্নীতি, ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অন্য কোনো অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তখন বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদের মতে, আদালত এমন ঘটনায় ছবি বা ভিডিও ধারণের উদ্দেশ্য এবং সেটি প্রকাশের কারণ বিবেচনা করতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে কোনো ব্যক্তি ঘুষ নিচ্ছেন—এমন ঘটনার ভিডিও যদি দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে প্রকাশ করা হয়, তাহলে সেটির উদ্দেশ্য নিছক ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
একইভাবে ধর্ষণ বা অন্য কোনো গুরুতর অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ছবি বা ভিডিও সংরক্ষণ ও আদালতে উপস্থাপনের বিষয়টিও আলাদাভাবে দেখা হবে।
সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থের প্রশ্ন
জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকরা অনেক সময় দুর্নীতি, ঘুষ, অপরাধ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ সংগ্রহের জন্য ছবি বা ভিডিও ধারণ করেন।
এ ধরনের ক্ষেত্রে কেবল অনুমতি নেওয়া হয়নি—এই একটি বিষয় দিয়ে পুরো ঘটনাকে বিচার করা যায় না। কেন ছবি বা ভিডিও ধারণ করা হয়েছে, সেটি কী উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে এবং এতে জনস্বার্থ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
তবে জনস্বার্থের কথা বললেই যে যেকোনো ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা যাবে, এমনটিও নয়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও জনস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু ছবি তোলা আর ছবি ছড়িয়ে দেওয়া এক বিষয় নয়
আইনজীবী ইশরাত হাসানের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কারও অনুমতি ছাড়া শুধু ছবি তোলার ঘটনাকে সব পরিস্থিতিতে সরাসরি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি।
কিন্তু সেই ছবি বা ভিডিও কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, কার কাছে পাঠানো হয়েছে, কোথায় প্রকাশ করা হয়েছে এবং এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কী ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ, কেউ ছবি তুলেছে বলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী হয়ে যাবে—এমন নয়। আবার ছবি তোলা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীর কোনো আইনি প্রতিকার নেই—এমন ধারণাও সঠিক নয়।
ভুক্তভোগীর কী করার সুযোগ আছে?
কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা হলে প্রথমেই সেই কনটেন্টের প্রমাণ সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। পোস্ট, ভিডিও, মেসেজ বা ছবি কোথায় প্রকাশ হয়েছে তার স্ক্রিনশট ও প্রয়োজনীয় তথ্য রাখা যেতে পারে।
ঘটনার ধরন অনুযায়ী আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে থানায় অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট সাইবার অপরাধ তদন্তকারী সংস্থায় যোগাযোগ কিংবা আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রতিকারের পথ খোলা থাকতে পারে।
বিশেষ করে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হলে বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত আইনি সহায়তা নেওয়া জরুরি।
শেষ কথা
স্মার্টফোনের যুগে ছবি তোলা খুব সহজ হলেও প্রতিটি ছবি প্রকাশের অধিকার সবার নেই। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, মর্যাদা বা গোপনীয়তার সঙ্গে বিষয়টি জড়িত হলে অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করার আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অপরাধ, দুর্নীতি বা জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
তাই অনুমতি ছাড়া কারও ছবি তুললেই সব ক্ষেত্রে অপরাধ হয়—এমন সরল উত্তর নেই। আবার ছবি বা ভিডিও প্রকাশের স্বাধীনতার নামে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও উপেক্ষা করা যায় না। শেষ পর্যন্ত ছবি বা ভিডিও কেন ধারণ করা হয়েছে, কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, এতে কারও ক্ষতি বা মানহানি হয়েছে কি না এবং জনস্বার্থ কতটা জড়িত—এসব বিষয়ই আইনি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

