পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন এক কৌশলগত সমীকরণ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সৌদি আরব সফরে একই সময়ে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। তিন দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সম্ভাব্য বৈঠককে ঘিরে ধারণা করা হচ্ছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে একটি নতুন ত্রিপাক্ষিক জোট গঠনের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই উদ্যোগ বাস্তবে রূপ পায়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, বরং ভারত, ইসরায়েল এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তিন দিনের সরকারি সফরে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন। তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং একটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধি দল।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতা, নিরাপত্তা সমন্বয় এবং দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করাই এই সফরের মূল উদ্দেশ্য।
একই সময়ে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। তুরস্কের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং শাহবাজ শরিফের সঙ্গে একটি ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন। এই ঘোষণার পর থেকেই সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা জোট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে।
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে আগে থেকেই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ আলোচনার পর সেই নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এখন আলোচনায় এসেছে, এই কাঠামোয় তুরস্ককেও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও একাধিক কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, তিন দেশের বৈঠকে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়।
যদি এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন সামরিক ও কৌশলগত অক্ষ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে।
এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি বড় কারণ—
- ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনা
- হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নিরাপত্তা সংকট
- লোহিত সাগরে হুথি হামলা
- জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা
- আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ার চেষ্টা
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহী বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের আগে জর্ডানে তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই চার দেশের সমন্বয়ে গঠিত কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্মটি ‘আর-ফোর’ নামে পরিচিত।
এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য—
- আঞ্চলিক সংঘাত কমানো
- যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রভাব সীমিত রাখা
- নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি
- কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদার করা
বিশ্লেষকদের মতে, ‘আর-ফোর’ ভবিষ্যতে বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত্তি হিসেবেও কাজ করতে পারে।
কাতারের লুসাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. মুহাম্মদ মাজহার শাহিন মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে।
তাঁর মতে, বর্তমান বৈঠকের পর তিন দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা জোট ঘোষণার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিনি আরও মন্তব্য করেছেন, যদি এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. গীতাঞ্জলি সিনহা রায়ের মতে, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তাঁর ভাষায়, এটি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ।
তুরস্ক বর্তমানে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প, বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তিতে বিশ্বের অন্যতম সফল দেশ।
একই সময়ে আঙ্কারা ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও বাড়িয়েছে।
তুরস্কের অভিযোগ, গাজা ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। ফলে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সমর্থন অর্জনের লক্ষ্যেও তুরস্ক সক্রিয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
সম্ভাব্য এই ত্রিপাক্ষিক জোট ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদেরও বিশেষভাবে ভাবাচ্ছে।
এর অন্যতম কারণ—
- পাকিস্তান ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক
- সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব
- ভারত-সৌদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
- ভারত-ইসরায়েল কৌশলগত অংশীদারিত্ব
এই পরিস্থিতিতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টেলিফোনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেছেন।
দুই নেতা ভারত-ইসরায়েল কৌশলগত অংশীদারিত্ব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যোগাযোগের পেছনে সৌদি আরবে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।
প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ কমার আঘার মতে, পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব যদি একটি সমন্বিত শক্তি অক্ষ গড়ে তোলে, তাহলে ভারতের উচিত তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা।
তিনি মনে করেন, ভারতের জন্য ইসরায়েল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে জ্বালানি, বিনিয়োগ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও ভারতের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে পাকিস্তান ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভারতের নিরাপত্তা হিসাবকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, তিন দেশের সম্ভাব্য সহযোগিতা প্রত্যেকের নিজস্ব শক্তিকে একত্রিত করতে পারে।
- সৌদি আরব অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাবের দিক থেকে শক্তিশালী।
- তুরস্ক উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প ও ড্রোন প্রযুক্তিতে এগিয়ে।
- পাকিস্তান পারমাণবিক সক্ষমতা এবং শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর অধিকারী।
এই তিন শক্তির সমন্বয় পশ্চিম এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
এখনও পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা জোট নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবে একই সময়ে সৌদি আরবে শাহবাজ শরিফ ও রেচেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের উপস্থিতি, ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তে থাকা আলোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে।
যদি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়, তাহলে শুধু পশ্চিম এশিয়াই নয়, ভারত, ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির শক্তির ভারসাম্যেও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।

