বিশ্বজুড়ে জলবায়ু নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে এল নিনো। বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলমান এল নিনো অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানল ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করছেন, পরিস্থিতি পূর্বাভাস অনুযায়ী এগোলে এটি গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও ক্ষতিকর এল নিনোতে পরিণত হতে পারে।
এল নিনো পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী জলবায়ুগত ঘটনা। এটি মূলত নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়। সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক ধরণ পরিবর্তিত হয়, যার প্রভাব পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ওপর।
“এল নিনো” শব্দটির উৎপত্তি পেরু থেকে। শত শত বছর আগে পেরুর জেলেরা লক্ষ্য করেছিলেন যে বড়দিনের সময় প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে অ্যাঙ্কোভি মাছের সংখ্যা হঠাৎ কমে যায়। তারা এই ঘটনাকে “এল নিনো” নামে অভিহিত করেন, যার অর্থ “শিশু যিশু”।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এটিকে একটি বৈশ্বিক জলবায়ু চক্র হিসেবে বিবেচনা করেন, যা পৃথিবীর আবহাওয়া ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম।
বিশ্বের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান এল নিনো অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি গড় তাপমাত্রার তুলনায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে গেলে সেটিকে শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে ধরা হয়।
তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু মডেল বলছে, ২০২৬ সালের শেষভাগ এবং ২০২৭ সালের শুরুতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বাড়তে পারে। কিছু পূর্বাভাসে এই বৃদ্ধি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কাও করা হয়েছে।
এ পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে পরিচিত ১৯৮২-৮৩ সালের ঘটনায় সমুদ্রের তাপমাত্রা গড়ে ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছিল। নতুন পূর্বাভাস সত্যি হলে সেই রেকর্ডও ভেঙে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয় না। এটি একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক চক্র। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
ইতিহাস বলছে, শক্তিশালী এল নিনোর পরপরই বৈশ্বিক তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়েছে। ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোর পর ১৯৯৮ সাল সে সময়ের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড গড়ে। একইভাবে ২০১৫-১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনোর পর ২০১৬ সাল নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড সৃষ্টি করে।
বর্তমানে ২০২৪ সাল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ডধারী। শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় সে বছর বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সালে আরও নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড তৈরি হতে পারে।
এল নিনোর প্রভাব পৃথিবীর সব অঞ্চলে এক রকম হয় না। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দেয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার কিছু অংশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা ও সাহেল অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময় দক্ষিণ আফ্রিকা এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক খরার অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। এবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সোমালিয়াতেও দীর্ঘমেয়াদি খরা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পরে হঠাৎ ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। কারণ দীর্ঘ সময় শুকিয়ে থাকা মাটি দ্রুত বৃষ্টির পানি শোষণ করতে পারে না, ফলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
শক্তিশালী এল নিনোর অন্যতম বড় প্রভাব পড়ে কৃষি উৎপাদনে। খরা, অতিবৃষ্টি এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর ফলে খাদ্যের দাম বাড়ে এবং অনেক অঞ্চলে খাদ্যসংকট দেখা দেয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এর সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চলমান অস্থিরতা এবং সার সরবরাহে চাপ কৃষি খাতকে অতিরিক্ত ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে সম্ভাব্য মানবিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদান, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, চাদ, ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলা এবং হাইতির মতো দেশগুলো এল নিনোর কারণে গুরুতর সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।
এসব দেশে আগে থেকেই খাদ্যাভাব, দারিদ্র্য, সংঘাত এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগের চাপ রয়েছে। নতুন করে খরা বা বন্যা দেখা দিলে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
যদিও এল নিনোকে পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে এর ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। এজন্য আগাম প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা খরাসহিষ্ণু বীজ ব্যবহার, কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, গবাদিপশুর জন্য খাদ্য ও পানি সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ-পূর্ব পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। পাশাপাশি আবহাওয়ার পূর্বাভাসভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং পানি সম্পদের সঠিক ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস যদি সত্যি হয়, তাহলে বর্তমান এল নিনো ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী জলবায়ুগত ঘটনায় পরিণত হতে পারে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ, দাবানল এবং খাদ্যসংকটের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।


