ফুটবল মাঠে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের হৃদয় জয় করেছেন লিয়োনেল মেসি। তবে শুধু মাঠের জাদুতেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস নিয়েও প্রায়ই আলোচনায় থাকেন এই আর্জেন্টাইন তারকা। বিশেষ করে, মেসিকে প্রায়ই একটি বিশেষ পাত্রে ধাতব স্ট্র দিয়ে পানীয় পান করতে দেখা যায়। সেই দৃশ্য বহুবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ফলে ফুটবলপ্রেমীদের মনে প্রশ্ন জেগেছে— আসলে কী পান করেন মেসি?
মেসির প্রিয় সেই পানীয়ের নাম ‘ইয়ারবা মাতে’। এটি কোনও বাজারচলতি এনার্জি ড্রিঙ্ক নয়। বরং দক্ষিণ আমেরিকার শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি জনপ্রিয় ভেষজ পানীয়, যা বর্তমানে বিশ্বজুড়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ইয়ারবা মাতে মূলত একটি ভেষজ পানীয়, যা ‘ইয়ারবা মাতে’ নামের বিশেষ গাছের শুকনো পাতা থেকে তৈরি করা হয়। দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে এবং ব্রাজিলে প্রতিদিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এই পানীয়।
অনেকের মতে, ইয়ারবা মাতে শুধু একটি পানীয় নয়; এটি সামাজিক বন্ধন ও সংস্কৃতির প্রতীক। পরিবার, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে মাতে পান করা দক্ষিণ আমেরিকার একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।
ইয়ারবা মাতে যে পাত্রে পরিবেশন করা হয়, সেই পাত্রের নামও ‘মাতে’। ঐতিহ্যগতভাবে এই পাত্র তৈরি করা হয় শুকনো লাউয়ের খোল দিয়ে। পরে কাঠ, ধাতু, চামড়া এবং বিভিন্ন অলংকার দিয়ে এটিকে আকর্ষণীয় রূপ দেওয়া হয়।
বর্তমানে আধুনিক নকশার পাশাপাশি সেরামিক, কাচ এবং কাঠের তৈরি মাতে পাত্রও বাজারে পাওয়া যায়। এসব পাত্র এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে দীর্ঘ সময় পানীয় গরম থাকে।
পানীয়টি পান করার জন্য ব্যবহার করা হয় একটি বিশেষ ধাতব স্ট্র, যার নাম ‘বম্বিলা’। সাধারণ স্ট্রের তুলনায় এটি আলাদা, কারণ এর নিচের অংশে একটি ফিল্টার বা ছাঁকনি থাকে। ফলে পান করার সময় পাতার কুচি মুখে আসে না এবং বিশুদ্ধ পানীয় সহজেই পান করা যায়।
ইয়ারবা মাতে তৈরির পদ্ধতি সাধারণ চা বা কফির থেকে কিছুটা ভিন্ন।
প্রথমে শুকনো ইয়ারবা মাতে পাতা সামান্য ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে নেওয়া হয়। এরপর সেই পাতা বিশেষ পাত্রে রাখা হয় এবং বম্বিলা স্ট্র বসানো হয়। তারপর ধীরে ধীরে গরম বা ঈষদুষ্ণ পানি ঢালা হয়।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইয়ারবা মাতে তৈরিতে ফুটন্ত পানি ব্যবহার করা হয় না। অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহার করলে পাতার স্বাদ ও গুণাগুণ নষ্ট হতে পারে। তাই সাধারণত হালকা গরম পানি ব্যবহার করা হয়।
অনেকে স্বাদ বাড়ানোর জন্য এতে লেবুর খোসা, কমলার খোসা, পুদিনাপাতা, মধু, চিনি কিংবা কফির গুঁড়োও মিশিয়ে থাকেন।
ইয়ারবা মাতে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে আর্জেন্টিনায় এটি জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে এবং ব্রাজিলেও ব্যাপকভাবে এই পানীয় পান করা হয়।
শুধু দক্ষিণ আমেরিকাই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সিরিয়া ও লেবাননেও ইয়ারবা মাতে পান করার প্রচলন রয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে, দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর হাত ধরেই এই পানীয়ের প্রচলন শুরু হয়েছিল।
ইয়ারবা মাতে পানের উপকারিতা
১. শরীরে সতেজতা আনে
ইয়ারবা মাতে পান করলে শরীর চনমনে থাকে এবং ক্লান্তি দূর হয়। অনেকেই একে প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিঙ্ক হিসেবেও বিবেচনা করেন।
ব্যায়াম বা কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের পর ইয়ারবা মাতে পান করলে পেশির জড়তা কমতে পারে। ফলে শরীর দ্রুত সতেজ অনুভূত হয়।
বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইয়ারবা মাতে বিপাকক্রিয়া উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
ইয়ারবা মাতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদানে সমৃদ্ধ। এসব উপাদান শরীরকে ফ্রি র্যাডিকেলের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে।
ইয়ারবা মাতেতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে মনে করা হয়। এটি কিছু ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং ছত্রাকজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ইয়ারবা মাতে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত গ্রহণের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লিয়োনেল মেসির কারণে ইয়ারবা মাতে এখন বিশ্বব্যাপী নতুন করে পরিচিতি পেয়েছে। তবে এই পানীয়ের জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু মেসির প্রভাব নয়, এর ঐতিহ্য, স্বাদ এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ফুটবলের মাঠে মেসির হাতে দেখা যাওয়া সেই বিশেষ পাত্র আসলে দক্ষিণ আমেরিকার বহু বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। আর তাই, ইয়ারবা মাতে আজ শুধু একটি পানীয় নয়, বরং একটি জীবনধারার অংশ হয়ে উঠেছে।


