খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeমেডিকেল জার্নালসেলাইয়ের দিন কি শেষ? অপারেশনের কাটা জোড়া দিতে নতুন আঠা তৈরি বিজ্ঞানীদের

সেলাইয়ের দিন কি শেষ? অপারেশনের কাটা জোড়া দিতে নতুন আঠা তৈরি বিজ্ঞানীদের

এই অভিনব চিকিৎসা-আঠা তৈরি করেছে কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (CSIR)-এর অধীন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ কেমিক্যাল টেকনোলজি (IICT)।

অপারেশনের পর কাটা অংশ জোড়া লাগাতে এতদিন সেলাই ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম প্রচলিত পদ্ধতি। দুর্ঘটনায় শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলেও ক্ষত বন্ধ করতে চিকিৎসকেরা সাধারণত সেলাইয়ের সাহায্য নেন। তবে এবার সেই প্রচলিত ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন এমন এক অভিনব চিকিৎসা-আঠা, যা শরীরের কাটা অংশ দ্রুত জোড়া লাগাতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নতুন আঠাটি দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হয়েছে। এর ব্যবহার সফল হলে নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্রোপচারে সেলাইয়ের প্রয়োজন কমতে পারে। শুধু তা-ই নয়, সেলাই করার পরও ক্ষত দ্রুত সারাতে এই আঠা সহায়ক হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

অস্ত্রোপচারের সময় শরীরের টিস্যু কাটা প্রায় অনিবার্য। সেই কাটা অংশ আবার জোড়া লাগাতে বর্তমানে সেলাই, স্ট্যাপল বা অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

নতুন এই আঠার মূল উদ্দেশ্য হলো কাটা টিস্যুকে দ্রুত একসঙ্গে ধরে রাখা। ফলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রচলিত সেলাইয়ের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

তবে সব ধরনের অস্ত্রোপচারে যে সেলাই পুরোপুরি উঠে যাবে, এমনটা এখনই বলা হচ্ছে না। চিকিৎসার ধরন, ক্ষতের অবস্থান এবং টিস্যুর প্রকৃতির ওপর নির্ভর করেই চিকিৎসকেরা এর ব্যবহার নির্ধারণ করবেন।

নতুন প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর জৈব সামঞ্জস্যতা। অর্থাৎ শরীরের টিস্যুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটি কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

দাবি অনুযায়ী, ব্যবহারের পর এটি শরীরের জন্য ক্ষতিকর কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি না করে ধীরে ধীরে শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

চিকিৎসাক্ষেত্রে এ ধরনের উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শরীরের ভেতরে ব্যবহার করা কোনো উপাদানকে নিরাপদ হওয়ার পাশাপাশি টিস্যুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়।

এই অভিনব চিকিৎসা-আঠা তৈরি করেছে কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (CSIR)-এর অধীন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ কেমিক্যাল টেকনোলজি (IICT)

দেশীয় গবেষণার মাধ্যমে তৈরি এই প্রযুক্তির পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এখন বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনার প্রক্রিয়ার অপেক্ষা।

দেশেই তৈরি হওয়ায় ভবিষ্যতে এটি তুলনামূলক কম দামে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট চিকিৎসাক্ষেত্রে এই আঠার ব্যবহার বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

ইএনটি সার্জারি: কান, নাক ও গলার বিভিন্ন অস্ত্রোপচারে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ভাস্কুলার সার্জারি: রক্তনালি সংক্রান্ত অস্ত্রোপচারেও এর সম্ভাব্য ব্যবহার রয়েছে।

কসমেটিক সার্জারি: শরীরের দৃশ্যমান অংশে ক্ষত বা কাটার দাগ কমানোর ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ডেন্টাল সার্জারি: দাঁত ও মুখের বিভিন্ন অস্ত্রোপচারে এর ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

পেরিওডোন্টাল সার্জারি: মাড়ি ও দাঁতের চারপাশের টিস্যুর চিকিৎসাতেও এই আঠা কাজে লাগতে পারে।

শুধু অস্ত্রোপচার নয়, দুর্ঘটনার কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে গেলেও ভবিষ্যতে এই ধরনের আঠা ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে দুর্ঘটনার সব ধরনের ক্ষতে এটি ব্যবহার করা যাবে—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। ক্ষতের গভীরতা, অবস্থান, রক্তপাত এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনা করেই চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

নতুন এই আঠার আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো, এটি শুধু সেলাইয়ের বিকল্প হিসেবে নয়, সেলাইয়ের সঙ্গে সমন্বয় করেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

অর্থাৎ কোনো অস্ত্রোপচারে চিকিৎসক যদি সেলাই করার সিদ্ধান্ত নেন, তার পরেও ক্ষত দ্রুত জোড়া লাগাতে আঠাটি ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

এতে ক্ষত নিরাময়ের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চিকিৎসা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন কোনো পদ্ধতি আবিষ্কারের পাশাপাশি সেটি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসাও বড় চ্যালেঞ্জ।

এই ক্ষেত্রে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হওয়ায় নতুন আঠাটির দাম তুলনামূলকভাবে কম রাখার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

যদি এটি কম খরচে বাজারে পাওয়া যায়, তাহলে উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির সুবিধা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।

নতুন এই আবিষ্কার চিকিৎসাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করলেও এখনই বলা যায় না যে অস্ত্রোপচারে সেলাইয়ের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

কারণ প্রতিটি অস্ত্রোপচার এক রকম নয়। কোথাও ক্ষত গভীর, কোথাও রক্তনালি বা গুরুত্বপূর্ণ টিস্যু জড়িত থাকে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ক্ষত বন্ধ করার জন্য শক্তিশালী যান্ত্রিক সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে।

তাই নতুন আঠা অনেক ক্ষেত্রে সেলাইয়ের বিকল্প বা সহায়ক পদ্ধতি হলেও চিকিৎসকের সিদ্ধান্তই শেষ কথা।

দেশীয় গবেষণায় তৈরি এই আঠা সফলভাবে বাজারে পৌঁছাতে পারলে ভারতের চিকিৎসা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে। বিশেষ করে কম খরচে টিস্যু জোড়া লাগানোর প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থায় নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

অপারেশনের পর ক্ষত দ্রুত জোড়া লাগানো, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেলাইয়ের প্রয়োজন কমানো এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তাই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বাস্তবে কত ধরনের অস্ত্রোপচারে এটি ব্যবহার করা যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর কার্যকারিতা কতটা, তা বাজারে ব্যবহারের পর আরও পরিষ্কার হবে। আপাতত দেশীয় বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।

আর্কাইভ