পৃথিবীর একেবারে গভীরে কী ঘটছে, তা সরাসরি চোখে দেখা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ভূকম্পন, কৃত্রিম উপগ্রহের তথ্য এবং পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা ভেতরের জগতের নানা রহস্য বোঝার চেষ্টা করেন। এবার সেই গবেষণাতেই উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর তথ্য।
পৃথিবীর গভীরে থাকা গলিত লোহার প্রবাহের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন বিজ্ঞানীরা। যে স্রোত সাধারণত পশ্চিমমুখী বলে ধারণা করা হয়, তার একটি অংশে পূর্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে পৃথিবীর বাইরের কেন্দ্র বা আউটার কোরে এই পরিবর্তন বিজ্ঞানীদের নজর কেড়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কেন হঠাৎ এমন দিক পরিবর্তন হচ্ছে? এই প্রশ্নের পুরোপুরি নিশ্চিত উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে নেই।
পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের নিচে যত গভীরে যাওয়া যায়, তাপমাত্রা ও চাপ ততই বাড়তে থাকে। পৃথিবীর অভ্যন্তরে রয়েছে কেন্দ্র বা কোর। এর বাইরের অংশকে বলা হয় আউটার কোর।
ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার নিচে অবস্থিত এই অঞ্চল মূলত অত্যন্ত উত্তপ্ত তরল ধাতু দিয়ে গঠিত। সেখানে লোহা ও অন্যান্য ধাতব উপাদানের প্রবাহ রয়েছে।
এই গলিত ধাতুর চলাচল পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আউটার কোরে তরল ধাতুর গতিশীলতা থেকেই পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তৈরি হয়।
আমাদের চারপাশে থাকা পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র চোখে দেখা যায় না। কিন্তু এটি পৃথিবীর জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূর্য থেকে ক্রমাগত চার্জযুক্ত কণা ও শক্তিশালী বিকিরণ পৃথিবীর দিকে আসে। চৌম্বকীয় ক্ষেত্র সেই সৌর কণার একটি বড় অংশ থেকে পৃথিবীকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।
এছাড়া কম্পাসের দিক নির্ধারণ থেকে শুরু করে পৃথিবীর মহাকাশ পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই চৌম্বকীয় ক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাই পৃথিবীর গভীরে থাকা গলিত ধাতুর গতিবিধিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করে আসছেন, পৃথিবীর আউটার কোরে থাকা গলিত লোহার প্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পশ্চিমমুখী।
কিন্তু নতুন পর্যবেক্ষণে সেই প্রবাহের মধ্যে পূর্বমুখী গতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ, পৃথিবীর গভীরে থাকা তরল ধাতু যেন নিজের স্বাভাবিক গতিপথের বিপরীতে এগোচ্ছে।
এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো ঘটনা কিনা, নাকি দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়ার অংশ—সেটিই এখন বিজ্ঞানীদের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন।
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা বা ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ESA)-এর কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে সংগৃহীত তথ্য পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সূক্ষ্ম পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সরাসরি পৃথিবীর ২ হাজার কিলোমিটারের বেশি গভীরে গিয়ে গলিত লোহার গতিবিধি দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা আউটার কোরের গতিশীলতা সম্পর্কে ধারণা পান।
এই তথ্য বিশ্লেষণ করেই প্রশান্ত মহাসাগরের নিচের অঞ্চলে অস্বাভাবিক প্রবাহের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞানীদের নজরে এই পরিবর্তন একেবারে হঠাৎ আসেনি।
প্রায় ২০১০ সাল থেকেই আউটার কোরের পশ্চিমমুখী প্রবাহে ধীরগতির প্রবণতা লক্ষ্য করা হচ্ছিল। একই সঙ্গে প্রবাহের মধ্যে পূর্বমুখী গতির কিছু ইঙ্গিতও ধীরে ধীরে সামনে আসছিল।
তবে সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ সেই পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এখন বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তন সাময়িক নাকি দীর্ঘমেয়াদি।
এখন পর্যন্ত এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর নেই।
পৃথিবীর আউটার কোর অত্যন্ত জটিল একটি ব্যবস্থা। সেখানে তাপমাত্রা, চাপ, তরল ধাতুর ঘনত্ব, পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং চৌম্বকীয় শক্তি—সবকিছু একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই কোনো একটি কারণকে দায়ী করে এই অস্বাভাবিক প্রবাহের ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আউটার কোরের অভ্যন্তরীণ গতিবিদ্যার পরিবর্তনের সঙ্গে এই ঘটনাটির সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও তথ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
গলিত লোহার গতিপথ বদলের খবর সামনে আসতেই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এর ফলে কি পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র দুর্বল হয়ে যেতে পারে?
এই মুহূর্তে এমন কোনো সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই।
আউটার কোরের প্রবাহ পরিবর্তনশীল হলেও তার অর্থ এই নয় যে পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র হঠাৎ বিপজ্জনকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র অত্যন্ত জটিল একটি ব্যবস্থা এবং এর পরিবর্তন দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করেই বোঝা সম্ভব।
তবে এই ধরনের অস্বাভাবিকতা চৌম্বকীয় ক্ষেত্র কীভাবে তৈরি ও পরিবর্তিত হয়, তা বুঝতে বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করতে পারে।
পৃথিবীর অভ্যন্তরের পরিবর্তন শুধু ভূবিজ্ঞানের কৌতূহলের বিষয় নয়। এর সঙ্গে পৃথিবীর চৌম্বকীয় পরিবেশ, মহাকাশ আবহাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্রহগত পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।
তাই আউটার কোরে গলিত লোহার আচরণ যত ভালোভাবে বোঝা যাবে, পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ পরিবর্তন সম্পর্কেও বিজ্ঞানীরা তত ভালো ধারণা পেতে পারবেন।
বর্তমান পর্যবেক্ষণ তাই বিজ্ঞানীদের কাছে একটি বড় গবেষণার দরজা খুলে দিয়েছে।
পৃথিবীর গভীরে গলিত লোহার প্রবাহের এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন আপাতত একটি বৈজ্ঞানিক রহস্য। কেন পশ্চিমমুখী প্রবাহ ধীর হয়ে পূর্বমুখী প্রবণতা তৈরি করছে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
তবে বিজ্ঞানীরা নতুন তথ্য সংগ্রহ, উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ এবং চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের পরিবর্তন বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই রহস্যের সমাধান খুঁজছেন।
পৃথিবীর ভেতরে চোখে দেখা যায় না এমন এই বিশাল ধাতব স্রোতের আচরণ শেষ পর্যন্ত আমাদের গ্রহ কীভাবে কাজ করে, সেই সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। তাই বিজ্ঞানীদের কাছে এই অস্বাভাবিকতা শুধু বিস্ময়ের নয়, বরং পৃথিবীর গভীর রহস্য বোঝার একটি নতুন সূত্র।

