নবজাতক শিশুকে গোসল করাতে গিয়ে শরীরের কোমর, নিতম্ব কিংবা পিঠে হঠাৎ নীলচে-ধূসর কোনো দাগ চোখে পড়লে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। অনেক সময় দাগটি দেখতে একেবারে কালশিটের মতো মনে হয়। তখন মনে হতে পারে, শিশুটি হয়তো কোথাও আঘাত পেয়েছে। কিন্তু সব নীলচে দাগ যে আঘাতের কারণে তৈরি হয়, তা নয়।
শিশুর শরীরে জন্মের সময় বা জন্মের পরপরই দেখা দেওয়া এমন একটি পরিচিত জন্মদাগ হলো মঙ্গোলিয়ান স্পট। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বর্তমানে একে কনজেনিটাল ডার্মাল মেলানোসাইটোসিস বলা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণ নিরীহ এবং শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করে না।
মঙ্গোলিয়ান স্পট হলো এক ধরনের জন্মদাগ, যার রং সাধারণত নীল, নীলচে-ধূসর কিংবা ধূসর-কালচে হয়ে থাকে। এটি ত্বকের ওপরিভাগে কোনো ক্ষত তৈরি করে না। ফলে দাগটি স্পর্শ করলে সাধারণত ত্বকের স্বাভাবিক অংশের মতোই অনুভূত হয়।
এই দাগকে অনেক সময় কালশিটে বা আঘাতের চিহ্ন মনে হয়। তবে এর সঙ্গে আঘাতের কোনো সম্পর্ক নেই। শিশুর শরীরে মেলানিন বা ত্বকের রং তৈরিতে ভূমিকা রাখা রঞ্জক কোষের অবস্থানের কারণেই এই ধরনের দাগ দেখা দেয়।
গর্ভে শিশুর শরীরের বিকাশের সময় মেলানোসাইট নামের রঞ্জক কোষগুলো ত্বকের নির্দিষ্ট স্তরে অবস্থান নেয়। সাধারণত এসব কোষ ত্বকের উপরের স্তরের দিকে থাকে। কিন্তু কিছু শিশুর ক্ষেত্রে মেলানোসাইটের একটি অংশ ত্বকের গভীর স্তর, অর্থাৎ ডার্মিসে অবস্থান করে থেকে যায়।
এই গভীর স্তরে রঞ্জক জমে থাকার কারণে ত্বকের ওপর নীলচে বা নীল-ধূসর রং দেখা যায়। আলো ত্বকের ভেতরের এই রঞ্জকের ওপর প্রতিফলিত হওয়ার কারণেও দাগের রং নীলচে মনে হতে পারে।
অর্থাৎ, শিশুর শরীরে এমন দাগ দেখা গেলে সেটিকে সরাসরি আঘাতের ফল হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
মঙ্গোলিয়ান স্পট সাধারণত শিশুর শরীরের নিচের অংশে বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে কোমরের নিচে, নিতম্বে এবং মেরুদণ্ডের গোড়ার দিকে এই দাগ বেশি চোখে পড়ে।
তবে শুধু এসব জায়গাতেই এটি সীমাবদ্ধ নয়। কিছু শিশুর পিঠ, কাঁধ, হাত-পা কিংবা শরীরের অন্য অংশেও এমন জন্মদাগ থাকতে পারে।
দাগের আকারও একেক শিশুর ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। কারও শরীরে কয়েক সেন্টিমিটার আকারের ছোট দাগ থাকে, আবার কারও ক্ষেত্রে তুলনামূলক বড় অংশজুড়ে নীলচে রং দেখা যায়।
এই জন্মদাগ সাধারণত সমতল হয়। ত্বকের ওপর কোনো গুটি বা উঁচু অংশ তৈরি করে না। একইভাবে ত্বকের পুরুত্ব বা গঠনেও সাধারণত পরিবর্তন দেখা যায় না।
এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ত্বকের রঙের পরিবর্তন। দাগটি নীল, নীলচে-ধূসর, ধূসর বা কিছু ক্ষেত্রে তুলনামূলক গাঢ় রঙের হতে পারে।
অনেক সময় এর প্রান্ত স্পষ্ট না হয়ে ধীরে ধীরে আশপাশের স্বাভাবিক ত্বকের সঙ্গে মিশে যায়। এ কারণেই দূর থেকে দাগটিকে কালশিটের মতো মনে হতে পারে।
সাধারণ মঙ্গোলিয়ান স্পট ক্ষতিকর নয়। এটি কোনো সংক্রমণ নয় এবং সাধারণত শিশুর ব্যথা, চুলকানি বা অস্বস্তির কারণও হয় না।
এ ধরনের জন্মদাগ থাকলে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বা দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে সাধারণত কোনো সমস্যা হয় না। তাই শুধু মঙ্গোলিয়ান স্পট থাকার কারণে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর কোনো চিকিৎসাও দরকার হয় না। চিকিৎসক দাগটি দেখে নিশ্চিত হলে বাবা-মাকে শুধু পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দিতে পারেন।
অনেক শিশুর ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গোলিয়ান স্পট ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়। কারও ক্ষেত্রে শৈশবের মধ্যেই এটি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
তবে সব শিশুর শরীরে দাগ একই গতিতে মিলিয়ে যায় না। কারও ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘ সময় ধরে দৃশ্যমান থাকতে পারে। আবার কিছু মানুষের শরীরে বড় বয়সেও এই ধরনের দাগ থেকে যেতে পারে।
তাই দাগটি দ্রুত চলে যাচ্ছে না দেখে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রে এর পরিবর্তনের ধরন আলাদা হতে পারে।
মঙ্গোলিয়ান স্পট বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিশুর মধ্যেই দেখা যেতে পারে। তবে কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি সাধারণ।
এ কারণে শিশুর শরীরে নীলচে-ধূসর দাগ থাকাকে রোগের লক্ষণ বা অস্বাভাবিকতা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এটি অনেক ক্ষেত্রেই শিশুর জন্মগত ত্বকের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
মঙ্গোলিয়ান স্পট নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো এর চেহারা। কারণ এটি অনেক সময় শরীরে আঘাতের পর তৈরি হওয়া কালশিটের মতো দেখতে হয়।
বিশেষ করে কোমর, নিতম্ব বা পিঠের মতো জায়গায় এমন দাগ থাকলে কেউ সেটিকে আঘাতের চিহ্ন বলে ভুল করতে পারেন। শিশুর বয়স কম হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও অযথা উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
তাই জন্মের পর শিশুর শরীরে এমন দাগ দেখা গেলে বিষয়টি শিশুর চিকিৎসককে জানিয়ে রাখা ভালো। প্রয়োজনে শিশুর মেডিকেল রেকর্ডে দাগটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। জন্মের সময় দাগটির ছবি সংরক্ষণ করাও ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে।
এতে পরবর্তীতে একই দাগকে নতুন কোনো আঘাতের চিহ্ন হিসেবে ভুল বোঝার সম্ভাবনা কমে।
মঙ্গোলিয়ান স্পট সাধারণত চিকিৎসার প্রয়োজন না হলেও শিশুর শরীরে দেখা দেওয়া প্রতিটি নীলচে দাগকে নিজে থেকেই মঙ্গোলিয়ান স্পট ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
দাগটি যদি জন্মের সময় উপস্থিত না থাকে এবং পরে হঠাৎ দেখা দেয়, দ্রুত আকার বা রং পরিবর্তন করে, ব্যথা বা চুলকানি সৃষ্টি করে, রক্তপাত হয় কিংবা ত্বকের গঠন বদলে যায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এ ছাড়া দাগের সঙ্গে শিশুর অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
চিকিৎসক সাধারণত শিশুর ত্বক ভালোভাবে পরীক্ষা করেই দাগটির ধরন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিতে পারেন। প্রয়োজন মনে করলে তিনি আরও পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
‘মঙ্গোলিয়ান স্পট’ নামটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে বর্তমানে কনজেনিটাল ডার্মাল মেলানোসাইটোসিস নামটি এই অবস্থাকে তুলনামূলকভাবে নির্ভুলভাবে বোঝায়।
কারণ এই নামটি মূলত ত্বকের ডার্মিস স্তরে মেলানোসাইট বা রঞ্জক কোষের উপস্থিতির বিষয়টিকে তুলে ধরে।
তবে শিশুর শরীরে নতুন কোনো দাগ দেখা দিলে সেটি কী কারণে হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। দাগের বৈশিষ্ট্য অস্বাভাবিক মনে হলে বা পরিবর্তন দেখা দিলে শিশুর চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

