বাগানে এমন কিছু ফুলগাছ থাকে, যেগুলো শুধু ফুলের সৌন্দর্যেই মন জয় করে না, বরং প্রতিদিন নতুন কোনো চমকও দেখায়। ‘ব্রুনফেলসিয়া’ তেমনই এক ব্যতিক্রমী ফুলগাছ। একই ফুল তিন দিনের মধ্যে তিন রকম রঙে বদলে যায়। প্রথম দিনে ফুল থাকে গাঢ় বেগনি, পরের দিন সেই রং ধীরে ধীরে ফিকে হয়, আর তৃতীয় দিনে ফুলটি হয়ে ওঠে সাদা।
ফুলের রঙের এই স্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণেই ব্রুনফেলসিয়া ফুলগাছের আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় এই গাছকে ‘ইয়েস্টারডে-টুডে-টুমরো’ নামেও ডাকা হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘Brunfelsia’। দক্ষিণ আমেরিকার এই গাছ উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় বেশ ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। ফলে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে শখের বাগান, বারান্দা কিংবা বাড়ির আঙিনাতেও এটি সৌন্দর্য বাড়াতে পারে।
ব্রুনফেলসিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো ফুলের রঙ বদলে যাওয়া। সাধারণ ফুলগাছের ক্ষেত্রে একটি ফুল ফুটে বেশ কিছুদিন একই রঙ ধরে রাখে। কিন্তু ব্রুনফেলসিয়ায় দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য।
ফুল ফোটার প্রথম দিনে এর পাপড়িতে থাকে গাঢ় বেগনি বা বেগনি রঙের আভা। তখন ফুলগুলো গাছের সবুজ পাতার মধ্যে বেশ উজ্জ্বল দেখায়। দ্বিতীয় দিনে বেগনি রং অনেকটাই হালকা হয়ে আসে। তৃতীয় দিনে সেই ফুল প্রায় সম্পূর্ণ সাদা হয়ে যায়।
একই গাছে পাশাপাশি থাকা ফুলের বয়স এক না হওয়ায় একই সময়ে বেগনি, হালকা বেগনি এবং সাদা ফুল দেখা যায়। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, গাছটিতে যেন একসঙ্গে তিন ধরনের ফুল ফুটেছে। এই বৈচিত্র্যই ব্রুনফেলসিয়াকে অন্য অনেক শখের ফুলগাছের তুলনায় আলাদা করে তোলে।
ব্রুনফেলসিয়ার আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল। বিশেষ করে ব্রাজিলসহ উষ্ণ অঞ্চলে এই গাছের দেখা মেলে। উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু গাছটির বৃদ্ধির জন্য বেশ উপযোগী।
তাই দক্ষিণ এশিয়ার অনেক অঞ্চলের আবহাওয়াতেও উপযুক্ত যত্নে ব্রুনফেলসিয়া বেড়ে উঠতে পারে। পর্যাপ্ত আলো, উষ্ণ পরিবেশ এবং পানি বের হওয়ার ভালো ব্যবস্থা থাকলে গাছটি সুন্দরভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়।
যারা বাগানে একটু ভিন্ন ধরনের ফুলগাছ রাখতে চান, তাদের জন্য ব্রুনফেলসিয়া আকর্ষণীয় একটি পছন্দ হতে পারে। কারণ শুধু ফুলের রং নয়, গাছটির ঝোপালো আকৃতিও বাগানে আলাদা সৌন্দর্য তৈরি করে।
এর উজ্জ্বল সবুজ পাতার সঙ্গে বেগনি থেকে সাদা হয়ে যাওয়া ফুলের বৈপরীত্য বেশ চোখে পড়ে। বিশেষ করে একই সময়ে বিভিন্ন রঙের ফুল ফুটলে গাছটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
বাড়ির বারান্দা, ছাদবাগান কিংবা ছোট আঙিনায় উপযুক্ত জায়গা থাকলে এই গাছ রাখা যায়। বড় বাগানে একাধিক গাছ পাশাপাশি রাখলেও সুন্দর একটি ফুলের আবহ তৈরি হতে পারে।
ব্রুনফেলসিয়া শুধু মাটিতে নয়, টবেও চাষ করা যায়। শখের বাগানপ্রেমীরা বড় টব বা উপযুক্ত আকারের পাত্র ব্যবহার করে বাড়িতেই এই গাছ রাখতে পারেন।
তবে টব বাছাইয়ের সময় একটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা জরুরি। পাত্রে যেন অতিরিক্ত পানি জমে না থাকে। টবের নিচে পর্যাপ্ত ছিদ্র থাকা দরকার, যাতে পানি সহজে বের হয়ে যেতে পারে।
মাটি হিসেবে পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত দোআঁশ মাটি ব্যবহার করা যেতে পারে। মাটি খুব বেশি শক্ত বা পানি ধরে রাখে এমন হলে গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই মাটি তৈরির সময় পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এই গাছের পরিচর্যা খুব কঠিন নয়। নিয়মিত নজর রাখলেই গাছকে সুস্থ ও সুন্দর রাখা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা।
মাটির ওপরের অংশ শুকিয়ে এলে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি দিতে হবে। তবে অতিরিক্ত পানি দিয়ে টব ভিজিয়ে রাখা ঠিক নয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে টবে পানি জমছে কি না, সেটি নিয়মিত দেখে নেওয়া দরকার।
গাছের শুকনো ফুল ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা দুর্বল ডালপালা সময়মতো ছেঁটে দিলে গাছের আকৃতি সুন্দর থাকে। পাশাপাশি নতুন শাখা ও ফুল আসার জন্যও ছাঁটাই কিছুটা সহায়ক হতে পারে।
ব্রুনফেলসিয়া গাছে নিয়মিত ফুল পেতে মাটিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকা জরুরি। তাই গাছের বৃদ্ধি ও ফুলের মৌসুম অনুযায়ী পরিমিত সার ব্যবহার করা যেতে পারে।
জৈব সার কিংবা ফুলগাছের জন্য উপযোগী সুষম সার ব্যবহার করা যায়। তবে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করলে গাছের ক্ষতি হতে পারে। তাই গাছের বয়স, টবের আকার এবং মাটির অবস্থার ওপর ভিত্তি করে পরিমিত সার দেওয়াই ভালো।
অন্যান্য শখের ফুলগাছের মতো ব্রুনফেলসিয়াতেও মাঝে মাঝে পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে অ্যাফিড বা মাইটের মতো ক্ষুদ্র পোকা গাছের পাতা ও কচি অংশে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তাই সপ্তাহে অন্তত একবার গাছের পাতা, কচি ডাল এবং ফুল ভালোভাবে দেখে নেওয়া ভালো। পাতায় অস্বাভাবিক দাগ, কুঁকড়ে যাওয়া বা ছোট পোকা দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
শুরুতেই সমস্যা শনাক্ত করা গেলে সাধারণত গাছকে সুস্থ রাখা সহজ হয়। প্রয়োজন হলে বাগান বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
শহরের বাড়িতে বড় বাগানের জায়গা না থাকলেও ব্রুনফেলসিয়া দিয়ে ছোট পরিসরে সৌন্দর্য তৈরি করা সম্ভব। বারান্দার এক পাশে বড় টবে গাছটি রাখা যেতে পারে। বাড়ির পাঁচিল বা প্রবেশপথের পাশে উপযুক্ত পাত্রে রাখলেও এটি দৃষ্টিনন্দন দেখায়।
বিশেষ করে একই গাছে যখন গাঢ় বেগনি, হালকা বেগনি ও সাদা ফুল একসঙ্গে দেখা যায়, তখন দূর থেকেও গাছটি সহজেই নজর কাড়ে। ফুলের সঙ্গে মৃদু সুবাস যোগ হওয়ায় এর আকর্ষণ আরও বাড়ে।
ব্রুনফেলসিয়া দেখতে সুন্দর হলেও বাড়িতে কুকুর, বিড়াল বা অন্য পোষ্য প্রাণী থাকলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। গাছের পাতা বা ফুল পোষ্য প্রাণী চিবিয়ে খেলে অসুস্থতা বা বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই পোষ্য প্রাণী থাকলে গাছটি এমন জায়গায় রাখা উচিত, যেখানে তারা সহজে পৌঁছাতে না পারে। শিশুদের ক্ষেত্রেও গাছের কোনো অংশ মুখে না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা ভালো।
প্রতিদিন ফুলের রং বদলে যাওয়ার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ব্রুনফেলসিয়াকে শখের বাগানের জন্য বেশ আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রথম দিনের গাঢ় বেগনি, দ্বিতীয় দিনের ফিকে রং এবং তৃতীয় দিনের সাদা ফুল সব মিলিয়ে একটি গাছেই প্রতিদিন নতুন দৃশ্য দেখা যায়।
যারা বাগানে প্রচলিত ফুলের পাশাপাশি একটু ব্যতিক্রমী কিছু যোগ করতে চান, তাদের জন্য ব্রুনফেলসিয়া হতে পারে চমৎকার একটি সংযোজন। সঠিক টব, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলো এবং সামান্য নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে এই রঙ বদলানো ফুলগাছ বাড়ির বাগানের সৌন্দর্য অনেকটাই বাড়িয়ে দিতে পারে।

