ভারতে বিশেষ একটি উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিলেন পাকিস্তানের নাগরিক রানা রউফ ওরফে ওয়াহাব আলম। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসছে বলে তদন্তকারীদের দাবি। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, ভারতীয় সেনা এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল রানার ওপর।
শুধু সীমান্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ নয়, কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলিও তাঁর নজরে ছিল বলে জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা। বিশেষ করে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম সম্পর্কে ছবি, ভিডিয়ো এবং মানচিত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন রানা। তদন্তকারীদের দাবি, পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এসটিএফ সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ভারতে আসার পর রানা রউফকে কয়েকটি নির্দিষ্ট কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ভারতীয় সেনা ও বিএসএফের কার্যকলাপ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।
তদন্তকারীদের মতে, কলকাতায় থাকার সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্থাপনার ওপর নজর রাখছিলেন। ফোর্ট উইলিয়ামের মতো স্পর্শকাতর জায়গা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল বলে পুলিশের দাবি।
ফোর্ট উইলিয়াম ভারতীয় সেনার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ফলে সেখানে ছবি, ভিডিয়ো কিংবা মানচিত্র সংগ্রহের মতো কর্মকাণ্ড নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
এসটিএফের দাবি, ফোর্ট উইলিয়াম সংক্রান্ত ছবি ও ভিডিয়ো সংগ্রহের কাজ শুরু করেছিলেন রানা। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার অবস্থান ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের চেষ্টাও করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশি তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো রানার সঙ্গে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের সম্ভাব্য যোগাযোগ। এসটিএফ সূত্রের দাবি, রানা আইএসআইয়ের হয়ে কাজ করছিলেন।
তদন্তকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতে স্থানীয়ভাবে একটি ‘সেল’ বা যোগাযোগের নেটওয়ার্ক তৈরি করার দায়িত্বও রানাকে দেওয়া হয়েছিল। সংবেদনশীল এবং গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য স্থানীয় লোকজনকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
অর্থাৎ, পুলিশের সন্দেহ শুধু একজন ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে আরও কয়েকজনের যোগাযোগ বা একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক জড়িত ছিল কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
রানাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও চার জন পাকিস্তানি চর বা সন্দেহভাজন ব্যক্তির সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে এসটিএফ। তাঁদের মধ্যে একজনের পরিচয় হিসেবে ‘জেডি’ নামটি সামনে এসেছে।
তবে ‘জেডি’ প্রকৃত নাম নাকি কোনও বড় নামের সংক্ষিপ্ত রূপ, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তদন্তকারীরা ওই ব্যক্তির পরিচয় ও রানার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টি যাচাই করছেন।
পুলিশ মনে করছে, এই যোগাযোগের সূত্র ধরে তদন্ত আরও বিস্তৃত হতে পারে। রানার সঙ্গে ওই ব্যক্তিদের কী ধরনের সম্পর্ক ছিল এবং তাঁরা ভারতে কী ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, তা জানতে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, রানা রউফ বাংলাদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। এ জন্য তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও করে ফেলেছিলেন।
পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পরিকল্পনা ছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি। সীমান্তের ওপারে ‘পাভেল’ নামে এক যুবক তাঁর অপেক্ষায় ছিলেন বলেও জানতে পেরেছে এসটিএফ।
তবে বাংলাদেশে যাওয়ার আগেই রানাকে গ্রেফতার করা হয়। ফলে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে যেতে পারেননি।
তদন্তকারীরা এখন পাভেল নামে ওই ব্যক্তির পরিচয় এবং রানার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। বাংলাদেশে যাওয়ার পর রানার কী পরিকল্পনা ছিল, সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন গোয়েন্দারা।
এসটিএফ সূত্রের দাবি, বাংলাদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার পর নিজের মোবাইল ফোন নষ্ট করে দিয়েছিলেন রানা। গ্রেফতারের সময় তাঁর কাছে কোনও বৈদ্যুতিন ডিভাইস পাওয়া যায়নি।
তদন্তকারীদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, কোনও ব্যক্তির মোবাইল ফোন থেকে যোগাযোগের তথ্য, অবস্থান, মেসেজ কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। ফোন নষ্ট করে দেওয়ার ঘটনা তাই তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে ফোনটি কীভাবে নষ্ট করা হয়েছিল এবং তার কোনও তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
মোবাইল ফোন না থাকলেও রানার সঙ্গে থাকা একটি ব্যাগ থেকে একটি নোটবুক উদ্ধার করেছে পুলিশ। ওই নোটবুকে বেশ কিছু ফোন নম্বর লেখা ছিল বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই নম্বরগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার নম্বরও রয়েছে বলে দাবি করেছে এসটিএফ।
এখন তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, এসব নম্বরের মালিক কারা এবং রানার সঙ্গে তাঁদের কী ধরনের যোগাযোগ ছিল। বিভিন্ন দেশের নম্বর একই নোটবুকে থাকার বিষয়টি কেন, তারও ব্যাখ্যা খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
এ ছাড়া রানার কাছ থেকে দুটি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ওই সিম কার্ড দুটির ব্যবহার এবং এগুলোর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সম্পর্ক ছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
পাকিস্তানি নাগরিকের গ্রেফতারি এবং সম্ভাব্য আইএসআই-যোগের তদন্তের মধ্যেই স্বাধীনতা দিবসের আগে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে।
বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে বনগাঁ সীমান্ত অঞ্চল এবং পেট্রাপোল এলাকায়। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে জিআরপি ও আরপিএফ যৌথভাবে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়েছে।
স্টেশন চত্বরে বম্ব স্কোয়াডের সাহায্যে তল্লাশি চালানো হয়েছে। মেটাল ডিটেক্টর দিয়েও পরীক্ষা করা হয়েছে বিভিন্ন এলাকা। পাশাপাশি যাত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরিচয়পত্র যাচাইয়ের কাজ চলছে।
রানা রউফের বাংলাদেশে যাওয়ার পরিকল্পনার তথ্য সামনে আসার পর সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে পূর্ব বর্ধমান থেকে আইএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের সন্দেহে হামিম মণ্ডল নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছিল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ। সেই ঘটনার সঙ্গে রানার যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
তবে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, হামিম মণ্ডলের সঙ্গে রানা রউফের কোনও সম্পর্ক এখনও পাওয়া যায়নি।
রানা রউফের গ্রেফতারির পর তদন্তকারীরা তাঁর যোগাযোগ, ভারতে আসার উদ্দেশ্য, বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক এবং বাংলাদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা—সবকিছু খতিয়ে দেখছেন। একই সঙ্গে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া নথি, নোটবুক ও সিম কার্ডের তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, কলকাতায় পাকিস্তানি নাগরিক রানা রউফের গ্রেফতারিকে ঘিরে তদন্ত নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে আইএসআইয়ের সঙ্গে তাঁর প্রকৃত সম্পর্ক, ফোর্ট উইলিয়াম সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য এবং সম্ভাব্য নেটওয়ার্কের বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। পুলিশের দাবি ও তদন্তে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতেই আপাতত পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা।

