খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদব্রিটেনে বিরল সূর্যগ্রহণ, আকাশজুড়ে মহাজাগতিক মুগ্ধতা; এরপরই আকাশে Perseid উল্কাবৃষ্টি

ব্রিটেনে বিরল সূর্যগ্রহণ, আকাশজুড়ে মহাজাগতিক মুগ্ধতা; এরপরই আকাশে Perseid উল্কাবৃষ্টি

বিরল এই মহাজাগতিক ঘটনা দেখতে বিপুল সংখ্যক মানুষ বেরিয়ে পড়ায় বিভিন্ন জনপ্রিয় পর্যবেক্ষণস্থলে যাতায়াত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষ করে গাড়ি চালানোর সময় আকাশের দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করা হয়।

ব্রিটেনজুড়ে যেন তৈরি হয়েছিল ‘সূর্যগ্রহণ জ্বর’। বিরল মহাজাগতিক দৃশ্যের সাক্ষী হতে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন সমুদ্রসৈকত, পার্ক, খোলা মাঠ এবং বিভিন্ন উঁচু ও মনোরম স্থানে। দিনের আকাশেই চাঁদের ছায়ায় সূর্যের বড় একটি অংশ ঢেকে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে উৎসাহের কমতি ছিল না।

চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখান দিয়ে অতিক্রম করে, তখন সূর্যের আলো আংশিকভাবে আড়াল হয়ে যায়। ব্রিটেনের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যাওয়া এই আংশিক সূর্যগ্রহণে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সূর্যের প্রায় ৯০ থেকে ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত ঢাকা পড়ে। ফলে দিনের আলো উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে চারপাশে তৈরি হয় এক অস্বাভাবিক পরিবেশ।

জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও পরিবারগুলোর কাছেও এই সূর্যগ্রহণ হয়ে ওঠে বছরের অন্যতম আকর্ষণীয় আকাশের ঘটনা।

ব্রিটেনের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার কিছু পর সূর্যগ্রহণ শুরু হয়। পর্যবেক্ষকের অবস্থান অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিট থেকে ৭টা ১৩ মিনিটের মধ্যে গ্রহণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর ধীরে ধীরে চাঁদ সূর্যের সামনে থেকে সরে যেতে থাকে এবং রাত ৮টার কিছু পর মহাজাগতিক এই দৃশ্য শেষ হয়।

গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কোথাও সূর্যের মাত্র একটি সরু আলোকিত অংশ দৃশ্যমান ছিল। দিনের আলোতে এমন দৃশ্য সাধারণ মানুষের জন্যও ছিল বেশ চমকপ্রদ।

আকাশ পরিষ্কার থাকার কারণে পশ্চিম দিগন্তের দিকে ভালো দৃশ্য পাওয়া যাবে—এমন জায়গাগুলোতে মানুষের ভিড়ও ছিল বেশি। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আগেভাগে পছন্দের জায়গায় পৌঁছে যান।

বিরল এই মহাজাগতিক ঘটনা দেখতে বিপুল সংখ্যক মানুষ বেরিয়ে পড়ায় বিভিন্ন জনপ্রিয় পর্যবেক্ষণস্থলে যাতায়াত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষ করে গাড়ি চালানোর সময় আকাশের দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করা হয়।

আকাশে অসাধারণ কোনো দৃশ্য দেখা গেলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনোযোগ সেদিকে চলে যেতে পারে। কিন্তু গাড়ি চালানোর সময় কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

তাই সূর্যগ্রহণ দেখতে হলে নিরাপদ ও স্থির কোনো জায়গায় অবস্থান করাই ছিল সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। রাস্তায় গাড়ি চালাতে চালাতে বা ব্যস্ত সড়কে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকানো থেকে সবাইকে সতর্ক করা হয়।

আরও পড়ুন :  মেসির বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন রেকর্ড, অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে নকআউট নিশ্চিত করল আর্জেন্টিনা

সূর্যগ্রহণ দেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল চোখের নিরাপত্তা। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন, উপযুক্ত সুরক্ষা ছাড়া সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো বিপজ্জনক।

অনেকে মনে করতে পারেন, সূর্যের বেশির ভাগ অংশ চাঁদ ঢেকে ফেলেছে বলে তখন সরাসরি তাকানো নিরাপদ। কিন্তু ধারণাটি ভুল। সূর্যের অবশিষ্ট আলোও চোখের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।

সাধারণ রোদচশমা সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় অনুমোদিত বিশেষ সোলার ভিউইং গ্লাস বা প্রত্যয়িত সৌর ফিল্টার।

বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। সূর্যগ্রহণ দেখানোর আগে অভিভাবকদের তাদের চোখের নিরাপত্তা সম্পর্কে বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি।

সূর্যগ্রহণ দেখতে গিয়ে শুধু মানুষের চোখ নয়, স্মার্টফোনের ক্যামেরা নিয়েও সতর্কতা জারি করা হয়।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সুরক্ষা ছাড়াই স্মার্টফোনের ক্যামেরা দিয়ে সরাসরি সূর্যের ছবি তুললে ক্যামেরার সেন্সর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ক্যামেরার লেন্স সূর্যের তীব্র আলো সেন্সরের একটি নির্দিষ্ট অংশে কেন্দ্রীভূত করতে পারে।

এর ফলে সেন্সরের কিছু পিক্সেল স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পরে তোলা ছবিতে কালো বা অস্বাভাবিক দাগ দেখা দিতে পারে। ক্যামেরা মেরামতের খরচও ফোনের মডেল এবং ক্ষতির মাত্রার ওপর নির্ভর করে বেশ বেশি হতে পারে।

সূর্যগ্রহণের ছবি তুলতে চাইলে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। শুধু ফোন হাতে নিয়ে সূর্যের দিকে ক্যামেরা তাক করলেই হবে না।

ক্যামেরার সামনে ফটোগ্রাফির জন্য তৈরি উপযুক্ত সোলার ফিল্টার ব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পদ্ধতি। বিশেষ করে বেশি জুম ব্যবহার করলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

সাধারণ সূর্যগ্রহণের চশমা ক্যামেরার লেন্সের সামনে ধরে সেটিকে ফোনের জুমের সঙ্গে ব্যবহার করাকে নিরাপদ সমাধান হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। দীর্ঘ সময় বা বেশি মাত্রার অপটিক্যাল কিংবা ডিজিটাল ম্যাগনিফিকেশনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ফটোগ্রাফিক সোলার ফিল্টার ব্যবহার করাই ভালো।

আরেকটি বিষয়ও মাথায় রাখা দরকার। এমন বিরল ঘটনা ক্যামেরাবন্দি করতে গিয়ে ফোনের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে বা স্টোরেজ ভরে গেলে পুরো পরিকল্পনাই ভেস্তে যেতে পারে। তাই আগে থেকেই ব্যাটারি চার্জ এবং পর্যাপ্ত স্টোরেজ নিশ্চিত করা বুদ্ধিমানের কাজ।

আরও পড়ুন :  ইনজেকশনের যন্ত্রণা থেকে বিশ্বসেরা! লিওনেল মেসির অবিশ্বাস্য জীবনের গল্প

সূর্যগ্রহণ শুধু চোখে দেখার মতো একটি দৃশ্য নয়, অনেকের কাছে এটি গভীর আবেগেরও বিষয়।

দিনের আকাশে হঠাৎ সূর্যের চেহারা বদলে যাওয়া, চারপাশের আলো কমে আসা এবং একই সঙ্গে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের বিশাল মহাজাগতিক সম্পর্ককে নিজের চোখে অনুভব করা—সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটি অনেকের কাছে স্মরণীয় হয়ে উঠতে পারে।

হাজার হাজার বছর ধরে সূর্যগ্রহণ মানুষের কৌতূহল ও বিস্ময়ের কারণ। আধুনিক বিজ্ঞান এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারলেও সরাসরি চোখের সামনে এমন দৃশ্য দেখার বিস্ময় এখনও কমেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আকাশের এই পরিবর্তন মানুষের মধ্যে বিস্ময়, উত্তেজনা এবং গভীর আবেগ তৈরি করতে পারে।

পৃথিবীর মাটিতে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন সূর্যগ্রহণ দেখছিল, তখন মহাকাশ থেকেও ধরা পড়ছিল বিরল এই দৃশ্য।

নাসা প্রকাশ করে এমন একটি চমকপ্রদ ছবি, যেখানে সূর্যের বিশাল চাকতির সামনে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (ISS) ক্ষুদ্র অবয়ব দেখা যায়। সূর্যের তুলনায় মহাকাশ স্টেশনটিকে সেখানে অত্যন্ত ছোট দেখালেও ছবিটি ছিল অসাধারণ আকর্ষণীয়।

মহাকাশ স্টেশনে তখন নভোচারীরাও অবস্থান করছিলেন। ফলে ছবিটি সূর্যগ্রহণকে পৃথিবীর প্রচলিত পর্যবেক্ষণ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ এনে দেয়।

সূর্যগ্রহণের উত্তেজনা শেষ হওয়ার পরও আকাশপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা করছিল আরেকটি আকর্ষণীয় মহাজাগতিক দৃশ্য—Perseid উল্কাবৃষ্টি।

প্রতি বছরই আগস্ট মাসে দেখা যায় এই উল্কাবৃষ্টি। আগস্টের ১২ ও ১৩ তারিখের দিকে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। পরিষ্কার ও অন্ধকার আকাশে তখন এক ঘণ্টায় কয়েক ডজন উল্কা দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তবে বাস্তবে কতগুলো উল্কা দেখা যাবে, তা নির্ভর করে পর্যবেক্ষণস্থানের আলো, আবহাওয়া, আকাশের স্বচ্ছতা এবং চাঁদের আলোর ওপর।

Perseid উল্কাবৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত রয়েছে Swift-Tuttle নামের ধূমকেতু। পৃথিবী যখন এই ধূমকেতুর রেখে যাওয়া ধূলিকণা ও ক্ষুদ্র কণার প্রবাহের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, তখন সেগুলোর কিছু অংশ প্রচণ্ড গতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে।

আরও পড়ুন :  যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা ভেঙে গেল: বৈঠক বর্জন করল ইরান

বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে ওই কণাগুলো উত্তপ্ত হয়ে জ্বলে ওঠে। রাতের আকাশে তখন দেখা যায় দ্রুত ছুটে যাওয়া উজ্জ্বল আলোর রেখা—যাকে আমরা উল্কা বা ‘শুটিং স্টার’ বলে থাকি।

সূর্যগ্রহণ দেখার পর যারা রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যেতে চান, তাদের জন্য মধ্যরাতের পর থেকে ভোর পর্যন্ত সময় বেশ উপযোগী হতে পারে।

বিশেষ করে রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে আকাশ পরিষ্কার ও অন্ধকার থাকলে উল্কা দেখার সুযোগ বাড়ে। এ জন্য কোনো বিশেষ টেলিস্কোপ বা জটিল যন্ত্রপাতির প্রয়োজন নেই।

শহরের উজ্জ্বল আলো থেকে দূরে কোনো খোলা জায়গা বেছে নেওয়া সবচেয়ে ভালো। এরপর কিছুক্ষণ অন্ধকারে অপেক্ষা করতে হবে, যাতে চোখ অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।

আরামদায়ক চেয়ার, প্রয়োজন অনুযায়ী গরম পোশাক এবং কিছুটা ধৈর্য থাকলে উল্কাবৃষ্টি দেখার অভিজ্ঞতা আরও আনন্দদায়ক হতে পারে।

একদিকে বিরল আংশিক সূর্যগ্রহণ, অন্যদিকে Perseid উল্কাবৃষ্টি—দুটি ভিন্ন ধরনের মহাজাগতিক দৃশ্য একই সময়ে আকাশপ্রেমীদের জন্য তৈরি করেছিল বিশেষ সুযোগ।

দিনের আলোয় চাঁদের ছায়ায় সূর্যের মুখ বদলে যাওয়া ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আর রাত নামার পর আকাশে একের পর এক উল্কার ঝলক সেই অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

সূর্যগ্রহণের মতো মহাজাগতিক ঘটনা কোনো নির্দিষ্ট স্থান থেকে বারবার দেখা যায় না। তাই ব্রিটেনের আকাশপ্রেমীদের কাছে এই ঘটনা ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে মহাজাগতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নিরাপত্তার কথাও ভুলে গেলে চলবে না। প্রত্যয়িত সোলার ভিউয়িং সরঞ্জাম ছাড়া সূর্যের দিকে তাকানো উচিত নয়। ছবি তুলতে হলে ক্যামেরার সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যস্ত রাস্তা বা যানবাহনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখার ঝুঁকি এড়িয়ে চলা জরুরি।

সব মিলিয়ে, সূর্যগ্রহণ ও উল্কাবৃষ্টির এই যুগল মহাজাগতিক আয়োজন মানুষকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—পৃথিবীর বাইরে বিস্তৃত আকাশ কতটা বিস্ময়কর। প্রযুক্তির যুগেও নিজের চোখের সামনে এমন দৃশ্য দেখা যে কতটা মুগ্ধকর হতে পারে, ব্রিটেনের আকাশপ্রেমীদের অভিজ্ঞতাই তার বড় প্রমাণ।

আর্কাইভ