প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান বাড়াতে শুধু হাসপাতালের অবকাঠামো, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা প্রযুক্তির উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। চিকিৎসক, রোগী ও রোগীর স্বজন এই তিন পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহানুভূতির সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। চিকিৎসা ব্যবস্থায় এই মানবিক সম্পর্ক দুর্বল হলে উন্নত অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
শনিবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের নবনির্মিত ১৫ তলা ‘ভবন-২’ বা ‘নিউরোসায়েন্স-২’-এর উদ্বোধন ও ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে চিকিৎসক, রোগী এবং রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজনদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্মান থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকরা যদি কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং রোগী বা স্বজনরা চিকিৎসকের ওপর আস্থা ও মর্যাদার সম্পর্ক অনুভব না করেন, তাহলে স্বাস্থ্যসেবার কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, হাসপাতালের অবকাঠামো যতই উন্নত করা হোক না কেন, চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্কের মধ্যে আস্থার সংকট থাকলে দেশের মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসবে না।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে, স্বাস্থ্যসেবা শুধু হাসপাতাল, চিকিৎসা যন্ত্র কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির বিষয় নয়। এর সঙ্গে মানুষের আচরণ, দায়িত্ববোধ, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সম্মানও গভীরভাবে জড়িত।
আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষ্য সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেবল হাসপাতালের ভবন নির্মাণ বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়। উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন এবং সময়োপযোগী নীতির সমন্বয় করতে হবে। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি রোগ শনাক্ত করতে পারে এবং চিকিৎসার বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একজন রোগীর ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক কষ্ট বোঝার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মানবিক আচরণের কোনো বিকল্প নেই।
রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার উদ্বেগ বুঝতে চেষ্টা করা এবং প্রয়োজনীয় আশ্বাস দেওয়া চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। সহানুভূতিশীল আচরণ রোগীর চিকিৎসার প্রতি আস্থা বাড়ায় এবং হাসপাতালের পরিবেশও ইতিবাচক করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসাসেবা ও হাসপাতালের পরিবেশ নির্বিঘ্ন রাখার দায়িত্ব শুধু চিকিৎসকদের নয়। এ দায়িত্ব চিকিৎসক, রোগী, স্বজনসহ সমাজের সব পক্ষের সম্মিলিত।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের নতুন ১৫ তলা ভবনকে দেশের নিউরোসায়েন্স চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, নতুন ভবনের মাধ্যমে স্ট্রোক, এপিলেপসি, পারকিনসন্স, ডিমেনশিয়া এবং মেরুদণ্ডের জটিল রোগের চিকিৎসা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ভবনটিতে সর্বাধুনিক আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার এবং ডায়াগনস্টিক সুবিধা থাকায় রোগীদের উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।
শুধু রোগীদের চিকিৎসা নয়, নতুন ভবনটি চিকিৎসা গবেষণা এবং উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য একই সঙ্গে উন্নত চিকিৎসা, গবেষণা ও দক্ষ চিকিৎসক তৈরির সুযোগ বাড়াতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
সময়ের চাহিদা অনুযায়ী হাসপাতালটিতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হয়েছে এবং এর পরিসরও বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। নতুন ভবনের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশের নিউরোসায়েন্স চিকিৎসার অবকাঠামো আরও শক্তিশালী হলো বলে তিনি মন্তব্য করেন।
স্বাস্থ্যসেবাকে রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক না রেখে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, উন্নত চিকিৎসার সুযোগ যদি শুধু শহরের বিত্তবান মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা বলা যাবে না।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ যাতে বিপুল অর্থ খরচ করে রাজধানীতে না এসেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারেন, সে লক্ষ্যে সরকার একটি আধুনিক রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ই-হেলথ কার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা তথ্য ও প্রয়োজনীয় রেফারেল প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
এ ছাড়া দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই একটি সুস্থ ও সক্ষম প্রজন্ম গড়ে তুলতে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
শিশুদের জন্য নতুন শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়নের পাশাপাশি শিশুস্বাস্থ্যের দিকেও সরকার বিশেষ নজর দিয়েছে বলে জানান তিনি। তার মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য—দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার কেবল একটি স্লোগান নয়। সরকার এমন একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করতে চায়, যাতে চিকিৎসার জন্য নাগরিকদের বিদেশে যেতে না হয়।
অর্থের অভাবে কোনো মানুষ যাতে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি। সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে একজন নাগরিক প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে বাধ্য হবেন না এবং আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কেউ চিকিৎসাবঞ্চিত হবেন না।
নতুন ভবনের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশের নিউরোসায়েন্স চিকিৎসা আরও এক ধাপ এগিয়েছে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, শুধু নতুন হাসপাতাল বা আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে আস্থা, স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা, হাসপাতালের সুশাসন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা সবকিছুর সমন্বয়েই একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। এ সময় সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

