ভারত প্রতি বছর ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করে। ১৯৪৭ সালের এই দিনেই ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পথচলা শুরু করে ভারত। কিন্তু স্বাধীনতার সেই ঐতিহাসিক দিনে ভারতের একটি অঞ্চল তখনও বিদেশি শাসনের অধীনে ছিল। সেটি হল গোয়া।
তবে গোয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু আলাদা। ১৯৪৭ সালে গোয়া ব্রিটিশ ভারতের অংশ ছিল না। প্রায় চার শতাব্দী ধরে এই অঞ্চল ছিল পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে ১৫ আগস্ট ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ ভারত স্বাধীন হলেও গোয়ার মানুষের জন্য ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটেনি।
আরও প্রায় ১৪ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক অভিযান ‘অপারেশন বিজয়’-এর মাধ্যমে গোয়ায় পর্তুগিজ শাসনের অবসান ঘটে। মাত্র প্রায় ৩৬ ঘণ্টার অভিযানের পর পর্তুগিজ বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। এই ঘটনাই গোয়ার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে।
ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস বলতে সাধারণত ব্রিটিশ শাসনের অবসানের কথাই সামনে আসে। কিন্তু উপমহাদেশের সব অঞ্চল ব্রিটিশদের হাতে ছিল না। গোয়া ছিল তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
পর্তুগিজরা ১৫১০ সালে গোয়া দখল করে। পর্তুগিজ নৌসেনা কমান্ডার আফোঁসো দে আলবুকার্কের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়। বিজাপুরের সুলতান ইউসুফ আদিল শাহের বাহিনীকে পরাজিত করার পর গোয়া পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আসে।
এরপর ধীরে ধীরে গোয়া এশিয়ায় পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে পরিণত হয়। বাণিজ্য, সমুদ্রপথ এবং প্রশাসনিক দিক থেকে গোয়ার গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট।
অন্যদিকে ব্রিটিশরা ভারতে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তার করলেও গোয়া পর্তুগিজদের অধীনেই থেকে যায়। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে গেলেও গোয়ার ওপর থেকে পর্তুগিজ নিয়ন্ত্রণ সরেনি।
এই কারণেই ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে গোয়ার অবস্থান কিছুটা ব্যতিক্রমী।
গোয়ার সঙ্গে পর্তুগিজদের সম্পর্ক শুরু হয় ষোড়শ শতকের গোড়ায়। ১৫১০ সালে আলবুকার্কের নেতৃত্বে পর্তুগিজ বাহিনী গোয়া দখল করে।
তখন ভারতীয় উপমহাদেশে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর প্রভাব বাড়তে শুরু করেছে। সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং বন্দর নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্তুগিজরা একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি তৈরি করছিল।
গোয়া সেই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গোয়া শুধু একটি উপনিবেশই ছিল না, পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের এশীয় কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে ওঠে। ফলে ব্রিটিশ শাসন ভারতে বিস্তৃত হওয়ার পরও গোয়ার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পর্তুগিজদের হাতেই থেকে যায়।
গোয়ার ইতিহাসে একটি বিষয় অনেকের কাছেই বিস্ময়ের। কিছু যুদ্ধপর্বে ব্রিটিশ সেনা গোয়ায় অবস্থান করেছিল। ১৭৯৭-৯৮ এবং ১৮০২-১৩ সালের যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনা সেখানে ঘাঁটি গেড়েছিল।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে গোয়া ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল।
সেই সময়ও গোয়ার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পর্তুগিজদের হাতেই ছিল। অর্থাৎ সামরিক কারণে ব্রিটিশ উপস্থিতি থাকলেও গোয়ার মূল ঔপনিবেশিক শাসক পরিবর্তিত হয়নি।
এই ইতিহাসই ১৯৪৭ সালের পর গোয়ার পরিস্থিতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার পর নতুন সরকারের সামনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল। দেশভাগ, উদ্বাস্তু সংকট, দেশীয় রাজ্যগুলির একীকরণ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল।
তার মধ্যেই গোয়ার প্রশ্ন সামনে আসে।
স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু শুরুতে কূটনৈতিক পথেই গোয়াকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পর্তুগালের তৎকালীন সরকার গোয়া ছাড়তে রাজি হয়নি।
ফলে আলোচনা থেকে সমাধান বের হয়নি।
এদিকে গোয়ার অভ্যন্তরেও পর্তুগিজ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন এবং আন্দোলনকারীরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
গোয়ার স্বাধীনতার দাবি ১৯৬১ সালের ঠিক আগে তৈরি হয়নি। এর শিকড় আরও গভীরে।
গোয়ান জাতীয়তাবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন ত্রিস্তাঁও দে ব্রাগান্সা কুনহা। ১৯২৮ সালে কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের সময় গোয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এরপর ১৯৪৬ সালে সমাজতান্ত্রিক নেতা রাম মনোহর লোহিয়া গোয়ায় একটি ঐতিহাসিক সভার নেতৃত্ব দেন। সেখানে নাগরিক স্বাধীনতা এবং পর্তুগিজ শাসনের অবসানের দাবি সামনে আসে।
পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের ধরনও বদলাতে থাকে। কোথাও শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহ হয়েছে, আবার কোথাও গোপন আন্দোলনের মাধ্যমে পর্তুগিজ প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে।
অর্থাৎ ১৯৬১ সালের সামরিক অভিযান ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের পরিণতিও।
১৯৬১ সালের শেষ দিকে ভারত ও পর্তুগালের মধ্যে গোয়া নিয়ে উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকে।
২৪ নভেম্বর একটি ভারতীয় যাত্রীবাহী জাহাজে পর্তুগিজ বাহিনীর গুলিবর্ষণের ঘটনায় একজন যাত্রী নিহত হন এবং কয়েকজন আহত হন। এই ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভারত সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেয়।
১৭ ডিসেম্বর রাতে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী গোয়া, দমন ও দিউয়ে অভিযান শুরু করে। এই সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন বিজয়’।
এটি ছিল স্থল, নৌ এবং বিমানবাহিনীর সমন্বিত অভিযান।
ভারতের সামরিক শক্তির তুলনায় পর্তুগিজ বাহিনী ছিল অনেক দুর্বল। ভারতীয় বাহিনী স্থলপথে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি নৌ ও বিমানবাহিনীর সহায়তাও নেয়।
অভিযান শুরু হওয়ার পর খুব দ্রুত পর্তুগিজ প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রায় ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই গোয়ায় পর্তুগিজ বাহিনীর প্রতিরোধ কার্যত শেষ হয়ে যায়। ১৯ ডিসেম্বর ১৯৬১ সন্ধ্যায় পর্তুগিজ গভর্নর-জেনারেল ম্যানুয়েল আন্তোনিও ভাসালো ই সিলভা আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন।
এর সঙ্গে শেষ হয় গোয়ায় প্রায় সাড়ে চার শতকের পর্তুগিজ শাসন।
১৫১০ সালে পর্তুগিজ দখলের পর থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় গোয়া পর্তুগিজ শাসনের অধীনে ছিল।
এই সময়ের মধ্যে ইউরোপীয় সংস্কৃতি, ধর্ম, স্থাপত্য, খাবার এবং ভাষার নানা প্রভাব গোয়ার সমাজে স্থায়ী ছাপ ফেলে। আজকের গোয়ার সংস্কৃতিতেও সেই দীর্ঘ পর্তুগিজ ইতিহাসের নানা চিহ্ন দেখা যায়।
তবে একইসঙ্গে পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের প্রতিরোধও গোয়ার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১৯৬১ সালের ডিসেম্বরের পর সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
অপারেশন বিজয়ের পর গোয়া সঙ্গে সঙ্গে ভারতের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যে পরিণত হয়নি।
প্রথমে গোয়া ছিল কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অংশ। পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গোয়ার মর্যাদা বদলায়।
অবশেষে ৩০ মে ১৯৮৭ সালে গোয়া ভারতের পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
এই দিনটি তাই গোয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে ১৯ ডিসেম্বর এখনও গোয়া, দমন ও দিউয়ের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে স্মরণ করা হয়। এই দিনটিই পরিচিত ‘গোয়া লিবারেশন ডে’ হিসেবে।
এই প্রশ্নের উত্তর আসলে গোয়ার ঔপনিবেশিক ইতিহাসের মধ্যেই রয়েছে।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটেছিল। কিন্তু গোয়ার শাসক ছিল পর্তুগাল। ফলে ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোয়া স্বাধীন হয়ে যায়নি।
গোয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পথ সম্পূর্ণ হয় ১৯৬১ সালের ১৯ ডিসেম্বর। ‘অপারেশন বিজয়’-এর মাধ্যমে পর্তুগিজ প্রশাসনের পতন এবং ভারতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর গোয়ার ঔপনিবেশিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
তাই ভারতের স্বাধীনতা দিবস ১৫ আগস্ট হলেও গোয়ার মুক্তির ইতিহাসে ১৯ ডিসেম্বরের গুরুত্ব আলাদা।
গোয়ার ইতিহাস শুধু একটি রাজ্যের ইতিহাস নয়। এটি ভারতের স্বাধীনতা ও একীকরণের বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরে।
ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় দেশের সব অঞ্চল একই রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ছিল না। কোথাও ছিল ব্রিটিশ শাসন, কোথাও দেশীয় রাজ্য, আবার গোয়ার মতো কিছু অঞ্চল ছিল ইউরোপীয় অন্য শক্তির অধীনে।
এই বৈচিত্র্য ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসকে আরও জটিল এবং একইসঙ্গে আকর্ষণীয় করে তোলে।
গোয়ার ক্ষেত্রে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা না এলেও পরবর্তী ১৪ বছরের রাজনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, স্থানীয় আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ১৯৬১ সালে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়।
আজ গোয়া ভারতের অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র। সমুদ্রসৈকত, স্থাপত্য, খাবার, উৎসব এবং সংস্কৃতির জন্য গোয়ার আন্তর্জাতিক পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু এই আধুনিক গোয়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাস।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়েছিল, কিন্তু গোয়ার স্বাধীনতার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও ১৪ বছর। ১৯৬১ সালের ‘অপারেশন বিজয়’ মাত্র প্রায় ৩৬ ঘণ্টায় সেই অপেক্ষার অবসান ঘটায়। আর ১৯ ডিসেম্বর হয়ে ওঠে গোয়ার মুক্তির ঐতিহাসিক দিন।

