খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালতারেক রহমানের ভারত সফর: দিল্লির আমন্ত্রণ, শেখ হাসিনা ইস্যুতে কী চায় বাংলাদেশ?

তারেক রহমানের ভারত সফর: দিল্লির আমন্ত্রণ, শেখ হাসিনা ইস্যুতে কী চায় বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাই ভারতের কাছে প্রত্যাশা রয়েছে, ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনা যেন এমন কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আবারও জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। ঢাকার একাধিক সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি সফরে যেতে পারেন তিনি। সম্ভাব্য সফরের সময় হিসেবে ২১ ও ২২ আগস্টের কথা আলোচনায় থাকলেও তারিখ কিছুটা এগিয়ে-পেছাতে পারে।

তবে সফরটি এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়নি। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠেছে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড।

সরকারি সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লি যাওয়ার প্রস্তাব ভারতের পক্ষ থেকেই দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশও নীতিগতভাবে সফরে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং সম্ভাব্য সফরকে সামনে রেখে প্রস্তুতি শুরু করেছে।

এর আগে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। পরে জুলাইয়ে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্যও তাকে দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

তবে ভারত সফরের ক্ষেত্রে ঢাকার কাছে শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রত্যাশাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। ঢাকার কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব বক্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উত্তেজনা তৈরি করছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাই ভারতের কাছে প্রত্যাশা রয়েছে, ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনা যেন এমন কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

এই বিষয়টি তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের আগে দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল দিল্লিতে তার বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছর পূর্তিতে ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট দিল্লিতে আওয়ামী লীগের আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি অডিও বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নের উত্তরও দেন।

ঘটনাটি নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। ঢাকার অভিযোগ ছিল, বাংলাদেশ সরকারের আপত্তির বিষয়টি জানার পরও ভারতের মাটিতে এমন একটি রাজনৈতিক আয়োজনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করে এবং দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে উদ্বেগ জানায়।

এই ঘটনার পর থেকেই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ঢাকার অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে সামনে রেখে বাংলাদেশের একটি বড় প্রত্যাশা হলো, শেখ হাসিনা যেন ভারত থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন।

সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত এ বিষয়ে এক ধরনের আশ্বাস দিয়েছে। তবে ঢাকার পক্ষ থেকে আরও স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ নিশ্চয়তা চাওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ, শুধু সফরের আমন্ত্রণ বা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নয়, শেখ হাসিনা ইস্যুতেও দুই দেশের মধ্যে একটি বোঝাপড়া তৈরি করতে চাইছে বাংলাদেশ।

এই সমঝোতা কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই আগস্টের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনেকটা নির্ভর করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শুধু দ্বিপক্ষীয় সফর নয়, ভারতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আমন্ত্রণ রয়েছে।

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের কথা রয়েছে। এই সম্মেলনে অতিথি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। জুলাইয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও এই আমন্ত্রণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

তবে ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। ২৮ জুলাই বাংলাদেশের তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও জানিয়েছিলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত তখনো হয়নি।

ফলে আগস্টে দ্বিপক্ষীয় সফর এবং সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলন—দুই ক্ষেত্রেই দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক নতুন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে আগ্রহী হলেও শেখ হাসিনা ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিএনপির নেতারাও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তারা গ্রহণযোগ্য মনে করেন না।

সরকারের কাছে বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত।

ফলে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থ ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।

অন্যদিকে, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির একটি অংশ।

দলটির নেতারা মনে করছেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে স্পষ্ট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত দিল্লি সফরের বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।

এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও এ নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, শেখ হাসিনার অবস্থান এবং দিল্লি থেকে তার রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয়টি নিষ্পত্তি না করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করা উচিত কি না, সেটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের ঘটনাকেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখেছেন।

তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর তাই নিছক একটি কূটনৈতিক সফর নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, শেখ হাসিনার অবস্থান, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক কূটনীতির বিষয়গুলো সরাসরি জড়িয়ে আছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ দুই দেশের দিক থেকেই দেখা গেছে। তবে তারেক রহমান সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরের জন্য ভারতকে বেছে নেননি। তিনি জুনে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন।

এতে বোঝা যায়, ঢাকা তার পররাষ্ট্রনীতিতে একাধিক দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে।

এখন দিল্লি সফর হলে সেটি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করবে।

তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আলোচনা যতই জোরালো হোক, সফরের চূড়ান্ত তারিখ এবং কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে সম্ভাব্য সফর হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশা। দিল্লির কাছ থেকে ঢাকা কতটা স্পষ্ট নিশ্চয়তা পায় এবং দুই দেশ কীভাবে বিষয়টি সমাধান করে, তার ওপর সফরের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।

একই সঙ্গে সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।

সব মিলিয়ে, আগস্টে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর এখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম আলোচিত বিষয়। সফরটি বাস্তবে হলে শেখ হাসিনা ইস্যু, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক কূটনীতি—তিন ক্ষেত্রেই নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

আর্কাইভ