বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাতে নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, অবসরকালীন সুবিধার অর্থ পেতে এখন থেকে শিক্ষকদের আর এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরতে হবে না। কোনো ধরনের হয়রানি, অনিয়ম কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ ছাড়াই নির্ধারিত সময়ে শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ সরাসরি অনলাইনে ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
শনিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাদের প্রাপ্য অর্থের একটি অংশ পেয়েছেন। ২০২২ সালের পর অর্থপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছিল, বিশেষ ব্যবস্থায় তার অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট’ এবং ‘অবসর সুবিধা বোর্ড’-এর মাধ্যমে এই অর্থ প্রদান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি টাকা পাঠানোর ফলে অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগতভাবে অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করার প্রয়োজন কমেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের পাওনা অর্থের অপেক্ষায় ছিলেন। তাদের সেই অনিশ্চয়তা দূর করতে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অবসরকালীন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের হয়রানির বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা সারা জীবন শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, আদর্শ ও মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়েছেন, তাদের নিজেদের প্রাপ্য অর্থ পেতে যদি ঘুষ বা অনিয়মের শিকার হতে হয়, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তার মতে, একজন শিক্ষককে নিজের পাওনা অর্থের জন্য দিনের পর দিন বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে বাধ্য করা শুধু ব্যক্তিগত হয়রানি নয়; এটি সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতারও প্রকাশ।
এ কারণে ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ দ্রুত পরিশোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। অনলাইনে আবেদন, যাচাই ও ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা গেলে শিক্ষক-কর্মচারীদের ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করা সহজ কাজ ছিল না বলেও অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আগের সরকারের সময়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য গঠিত দুটি তহবিল নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, জাল ইনডেক্স তৈরি, তহবিলের অর্থ দুর্বল ব্যাংকে স্থানান্তর এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নষ্ট করার মতো কর্মকাণ্ডের কারণে সংশ্লিষ্ট তহবিলগুলো সংকটে পড়ে। এর ফলে ২০২২ সালের পর অনেক শিক্ষক-কর্মচারী তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলেও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দুরবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় অর্থ পরিশোধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
অবসর সুবিধার অর্থ সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর উদ্যোগকে শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রচলিত ব্যবস্থায় কোনো সুবিধাভোগীকে যদি বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যেতে হয়, তাহলে সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়। পাশাপাশি দীর্ঘসূত্রতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ তৈরির আশঙ্কাও থাকে।
অনলাইনভিত্তিক ব্যবস্থায় এসব সমস্যা কমানোর সুযোগ রয়েছে। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিজের বাড়িতে থেকেই অর্থপ্রাপ্তির তথ্য জানতে পারবেন এবং ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করতে পারবেন। বিশেষ করে বয়স্ক শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য এমন ব্যবস্থা স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভোগান্তি থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো যোগ্য ও প্রাপ্য সুবিধাভোগীর কাছে তার অধিকার যথাসময়ে পৌঁছে দেওয়া।
বেসরকারি শিক্ষকদের কল্যাণ ও অবসর সুবিধার প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রসঙ্গও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট’ এবং ২০০২ সালে ‘অবসর সুবিধা বোর্ড’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরকালীন নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, শুরুতে ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে তহবিল গঠন করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তা ৮৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। একই সঙ্গে শিক্ষা উপবৃত্তি ও নারী শিক্ষায় বিনা বেতনে পড়ার সুযোগের মতো উদ্যোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকতা এমন একটি পেশা, যার মাধ্যমে অন্য সব পেশার মানুষ তৈরি হয়। একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক, সাংবাদিক কিংবা বিজ্ঞানীর পেছনেও কোনো না কোনো শিক্ষকের অবদান থাকে।
তাই চাকরি থেকে অবসর নিলেও একজন শিক্ষকের সামাজিক দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। সমাজে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিকতার চর্চা বাড়াতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা সমাজের জন্য সম্পদ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তারা সমাজকে আলোর পথ দেখাতে পারেন।
শিক্ষকদের অবসর সুবিধা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে দিতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। আবেদন থেকে শুরু করে তথ্য যাচাই এবং অর্থ ছাড় প্রতিটি ধাপ ডিজিটাল হলে জটিলতা কমানো সম্ভব।
একজন শিক্ষক দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরে যাওয়ার পর তার প্রাপ্য অর্থের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলে তা তার পারিবারিক জীবনে আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। তাই অবসর সুবিধা দ্রুত পরিশোধের পাশাপাশি নিয়মিতভাবে তহবিলের আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যেখানে একজন শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তার প্রাপ্য অর্থ পেয়ে যাবেন। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে আস্থা বাড়বে এবং অবসর সুবিধা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতাও জোরদার হবে।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এবং শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

