বিশ্বকাপের মঞ্চে অবশেষে জয়ের স্বাদ পেল ব্রাজিল। হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের দাপুটে জয়ে ফুটবলপ্রেমীরা আবারও দেখলেন সেই চেনা ব্রাজিলকে। আক্রমণ, গতি, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিগত দক্ষতার মিশেলে প্রতিপক্ষকে পুরো ম্যাচজুড়ে চাপে রেখেছিল কার্লো আনচেলোত্তির দল। তবে জয়ের আনন্দের মাঝেও কিছু উদ্বেগের কারণ সামনে এসেছে। বিশেষ করে রাফিনহার চোট এবং একাধিক সহজ সুযোগ নষ্ট করা ভবিষ্যতের বড় ম্যাচগুলোর আগে চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ব্রাজিলের জয়ের নায়ক নিঃসন্দেহে ভিনিসিয়াস জুনিয়র। পুরো ম্যাচজুড়ে তিনি ছিলেন দলের আক্রমণের প্রাণকেন্দ্র। একটি গোল করার পাশাপাশি একটি গোলে সরাসরি সহায়তা করেছেন এবং অসংখ্য আক্রমণ তৈরি করেছেন। তাঁর গতি, ড্রিবলিং এবং বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা হাইতির রক্ষণভাগকে বারবার বিপদে ফেলেছে।
ম্যাচের শুরুতে দুই দলই নিজেদের ছন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রথম দশ মিনিটের পর থেকে ব্রাজিল পুরোপুরি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। বলের দখল, আক্রমণের গতি এবং খেলার ছন্দ সবকিছুই ছিল ব্রাজিলের হাতে। হাইতির ফুটবলারদের অনেক সময় দর্শকের ভূমিকায় দেখা গেছে।
ব্রাজিলের প্রথম গোল আসে ম্যাচের ২৩তম মিনিটে। ভিনিসিয়াসের শক্তিশালী শট হাইতির গোলরক্ষক জনি প্লাসিড প্রতিহত করলেও ফিরতি বলে তৈরি হয় গোলের সুযোগ। ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বল ম্যাথেউস কুনহার সামনে চলে আসে এবং সামান্য দিক পরিবর্তন করে জালে জড়িয়ে পড়ে। গোলটি কুনহার নামের পাশে গেলেও পুরো আক্রমণের সূচনা করেছিলেন ভিনিসিয়াস।
৩৬তম মিনিটে আবারও ভিনিসিয়াসের দুর্দান্ত অবদান। মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে তিনি নিখুঁত থ্রু পাস দেন কুনহাকে। চাপের মধ্যেও কুনহা দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে নিজের নামও স্কোরশিটে তোলেন ভিনিসিয়াস। লুকাস পাকুয়েতার দূরপাল্লার পাস ধরে গতি দিয়ে ডিফেন্ডারকে পেছনে ফেলে ডান পায়ের শটে গোল করেন তিনি। সেই গোলেই কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায় ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ জয়।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে অনেক পিছিয়ে থাকা হাইতি শুরু থেকেই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছিল। তবুও তারা শুধু রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলেনি। সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। ৬৩তম মিনিটে কর্নার থেকে প্রায় গোল পেয়ে গিয়েছিল তারা, কিন্তু ব্রাজিলের গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার দুর্দান্ত সেভ করে দলকে বিপদমুক্ত করেন।
হাইতির কোচ জোনাল মার্কিং কৌশল ব্যবহার করে ব্রাজিলকে আটকে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ব্রাজিলের দ্রুত পাসিং এবং ব্যক্তিগত দক্ষতার সামনে সেই পরিকল্পনা বেশিক্ষণ টেকেনি। একের পর এক আক্রমণে হাইতির রক্ষণভাগ ভেঙে পড়ে।
এই ম্যাচে ব্রাজিল নিজেদের পরিচিত আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিয়েছে। ঘন নীল ও সমুদ্র-সবুজ জার্সিতে খেললেও মাঠে তাদের ফুটবলই ছিল আসল পরিচয়। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি, আর্জেন্টিনা কিংবা পর্তুগালের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে কি একই আধিপত্য দেখাতে পারবে তারা?
বর্তমান ব্রাজিল দলকে অনেকটাই ভিনিসিয়াসনির্ভর মনে হচ্ছে। তিনি না থাকলে সৃজনশীলতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। বড় প্রতিযোগিতায় সফল হতে হলে দলের অন্যান্য আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দেরও সমানভাবে দায়িত্ব নিতে হবে।
৩-০ ব্যবধানের জয় দেখলে মনে হতে পারে ব্রাজিল খুব সহজেই ম্যাচটি জিতেছে। কিন্তু বাস্তবে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত। একাধিক নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করেছেন ব্রাজিলের ফরোয়ার্ডরা।
রাফিনহা প্রথমার্ধেই একটি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন। গোলরক্ষকের সঙ্গে একা অবস্থায় থেকেও তিনি জাল খুঁজে পাননি। গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিও কয়েকটি সম্ভাবনাময় আক্রমণ নষ্ট করেন। ম্যাচজুড়ে অফসাইডের সমস্যাও দেখা গেছে। রাফিনহার একটি গোল বাতিল হয় এবং পরবর্তীতে বদলি হিসেবে নামা এনদ্রিকের গোলও অফসাইডের কারণে গণ্য হয়নি।
বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে এমন সুযোগ নষ্ট করলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মূল্য দিতে হতে পারে।
জয়ের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক ছিল রাফিনহার চোট। প্রথমার্ধে পেশীতে সমস্যার কারণে ৪০ মিনিটের মাথায় মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। এখন তাঁর চোটের প্রকৃতি এবং পুনরুদ্ধারের সময় নিয়ে ব্রাজিল শিবির উদ্বিগ্ন।
রাফিনহা ব্রাজিলের আক্রমণভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাঁর অনুপস্থিতি ভবিষ্যতের ম্যাচগুলোতে দলের কৌশলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কোচ কার্লো আনচেলোত্তিকে এখন বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে হবে।
এই জয় ব্রাজিলকে আত্মবিশ্বাস দিলেও সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। আনচেলোত্তিকে বিশেষভাবে কাজ করতে হবে তিনটি বিষয়ে—ফিনিশিংয়ের উন্নতি, অফসাইড ফাঁদ এড়ানোর কৌশল এবং ভিনিসিয়াসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।
বিশ্বকাপ জিততে হলে শুধু প্রতিভা নয়, ধারাবাহিকতা এবং কার্যকারিতাও জরুরি। হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিল সেই সম্ভাবনার আভাস দিয়েছে, কিন্তু বড় দলগুলোর বিরুদ্ধে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হলে আরও উন্নতি করতে হবে।
হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে বিশ্বকাপে প্রথম বিজয় তুলে নিয়েছে ব্রাজিল। ভিনিসিয়াস জুনিয়রের অসাধারণ পারফরম্যান্সে উজ্জ্বল ছিল সেলেসাওদের ফুটবল। তবে জয়ের উচ্ছ্বাসের মাঝেও রাফিনহার চোট, সহজ সুযোগ নষ্ট করা এবং অফসাইড সমস্যার মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। যদি এই দুর্বলতাগুলো দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারে, তাহলে বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে ব্রাজিল।

