বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসি আবারও ইতিহাস গড়েছেন বিশ্বকাপের মঞ্চে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স শুধু ভক্তদেরই নয়, আবেগাপ্লুত করেছে তার পরিবারকেও। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-০ গোলের জয়ে নতুন বিশ্বকাপ রেকর্ড গড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন মেসি। আর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের পর হৃদয়স্পর্শী বার্তা দিয়ে স্বামীকে অভিনন্দন জানান তার স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো।
ডালাসে অনুষ্ঠিত গ্রুপ জে-এর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় অস্ট্রিয়ার। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে ম্যাচের নবম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করার সুযোগ পেয়েও লক্ষ্যভ্রষ্ট হন মেসি।
কিন্তু বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে তিনি দ্রুতই নিজের ভুল শুধরে নেন। ম্যাচের মাঝামাঝি সময়ে দুর্দান্ত কার্লিং শটে গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন। সেই গোলের মাধ্যমেই তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে এককভাবে উঠে যান।
এই অর্জনের আগে তিনি জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের সঙ্গে সমান ১৬ গোল নিয়ে অবস্থান করছিলেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোলটি করে তিনি রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাসের জন্ম দেন।
বিশেষ এই দিনটিকে আরও অর্থবহ করে তুলেছিল মেসির পরিবারের উপস্থিতি। ডালাস স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন তার স্ত্রী আন্তোনেলা এবং তিন ছেলে—থিয়াগো, মাতেও ও সিরো।
গ্যালারি থেকে তারা প্রত্যক্ষ করেন মেসির আরেকটি ঐতিহাসিক রাত। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য ট্রফি ও রেকর্ড জিতলেও পরিবারের সামনে এমন অর্জন নিঃসন্দেহে মেসির জন্য ছিল বিশেষ অনুভূতির।
ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসির জন্য একটি হৃদয়ছোঁয়া পোস্ট করেন আন্তোনেলা। তিনি লেখেন,
“বারবার তোমাকে ইতিহাস গড়তে দেখা সত্যিই এক অসাধারণ সৌভাগ্য। আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
তার পোস্টে ছিল পরিবারের একাধিক ছবি। সেখানে দেখা যায়, আন্তোনেলা ও তাদের তিন সন্তান একই ডিজাইনের আর্জেন্টিনা দলের মেসি নাম্বার ১০ জার্সি পরে স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও তিনি ভিআইপি বক্সে তোলা নিজের কিছু ছবিও শেয়ার করেন, যেখানে তার জার্সির পেছনে মেসির নাম স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
অনেকেই আন্তোনেলাকে শুধু লিওনেল মেসির স্ত্রী হিসেবে চিনলেও বাস্তবে তিনি নিজেই একজন সফল ব্যক্তিত্ব। গত কয়েক বছরে তিনি ব্যবসা, ফ্যাশন এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলেছেন।
বর্তমানে তিনি একজন জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, সফল ব্যবসায়ী, শিশুদের ফ্যাশন ব্র্যান্ডের মালিক এবং মডেল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফিটনেস ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করে তিনি নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছেন।
মানবিক কর্মকাণ্ডেও তার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন দাতব্য উদ্যোগে অংশ নিয়ে তিনি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছেন।
অনেকেই জানেন না যে আন্তোনেলার প্রথম স্বপ্ন ছিল ডেন্টিস্ট বা দাঁতের ডাক্তার হওয়া। তিনি সে লক্ষ্যেই পড়াশোনা শুরু করেছিলেন।
তবে জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন মেসির ফুটবল ক্যারিয়ার দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে। ভালোবাসার মানুষকে সমর্থন করতে তিনি নিজের পেশাগত পরিকল্পনা বদলে দেন এবং মেসির পাশে দাঁড়ান।
বার্সেলোনা থেকে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইন এবং পরে ইন্টার মায়ামি—প্রতিটি ক্লাব অধ্যায়ে আন্তোনেলা ছিলেন মেসির সবচেয়ে বড় সমর্থক।
লিওনেল মেসি এবং আন্তোনেলার প্রেমের গল্প ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আলোচিত সম্পর্কগুলোর একটি। দুজনের পরিচয় শৈশব থেকেই। একই শহর রোসারিওতে বেড়ে ওঠা এই জুটি বহু বছর সম্পর্কের পর ২০১৭ সালের ৩০ জুন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
তাদের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে সে সময় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
বর্তমানে এই দম্পতির তিন সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে থিয়াগোর জন্ম ২০১২ সালে। এরপর ২০১৫ সালে জন্ম নেয় মাতেও। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য সিরোর জন্ম হয় ২০১৮ সালে।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে শুধু রেকর্ড গড়েই থেমে থাকেননি মেসি। পুরো ম্যাচজুড়েই ছিলেন প্রাণবন্ত ও কার্যকর।
প্রথম গোলের পর দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে আরও একটি গোল করেন তিনি। গোলটি ছিল তার ধৈর্য, অভিজ্ঞতা এবং অসাধারণ ফুটবল বুদ্ধিমত্তার নিখুঁত উদাহরণ।
প্রথমে সতীর্থ জুলিয়ান আলভারেজকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দিতে চেয়েছিলেন মেসি। তবে অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক সেই প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেন। পরে বলটি আবার মেসির কাছে ফিরে আসে। গোলরক্ষককে কাটিয়ে শট নিলেও তা এক ডিফেন্ডার আটকে দেন।
কিন্তু বলের নিয়ন্ত্রণ হারাননি মেসি। রিবাউন্ডে বল ফিরে পেয়ে ঠান্ডা মাথায় জালে পাঠিয়ে আর্জেন্টিনার ২-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন।
এই ম্যাচে গোল করার মাধ্যমে মেসি আরও একটি অনন্য কীর্তি গড়েন। তিনি বিশ্বকাপের টানা ছয় ম্যাচে গোল করা মাত্র তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান।
এর আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন এবং ব্রাজিলের জাইরজিনহো। যথাক্রমে ১৯৫৮ ও ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে তারা এই রেকর্ড করেছিলেন।
মেসির ধারাবাহিকতা এবং বড় ম্যাচে পারফর্ম করার ক্ষমতা আবারও প্রমাণ করেছে কেন তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৩৮ বছর বয়সেও লিওনেল মেসি যেভাবে রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে চলেছেন, তা ফুটবলপ্রেমীদের বিস্মিত করছে। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা ক্লাব ফুটবল—সব জায়গাতেই তিনি নিজের ছাপ রেখে গেছেন।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে এই ম্যাচ শুধু একটি জয় নয়, বরং মেসির অসাধারণ ক্যারিয়ারের আরেকটি স্বর্ণালি অধ্যায়। আর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে পরিবারের ভালোবাসা ও আন্তোনেলার আবেগঘন বার্তা পুরো ঘটনাকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছে।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে লিওনেল মেসির নাম আগেই অমর হয়ে গেছে। তবে তিনি যেন প্রতিটি ম্যাচে নিজের কিংবদন্তিকে আরও বড় করে তুলছেন।


