ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ। এবারই প্রথম ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে আয়োজন করা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ ঘিরে ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে ব্যাপক উত্তেজনা। বিশেষ করে উদ্বোধনী লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা—যে দুই দল ১৬ বছর আগে ২০১০ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেও একে অপরের প্রতিপক্ষ ছিল।
২০১০-এর স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে উদ্বোধনী ম্যাচ
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে কিছু উদ্বোধনী ম্যাচ বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকো। সেই ম্যাচটি শেষ হয়েছিল ১-১ সমতায়। তবে ফলাফলের চেয়েও বেশি আলোচিত হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার সিফিওয়ে শাবালালার অসাধারণ গোল, যা আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেও আবার সেই একই দুই দল মাঠে নামছে। ফলে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে নস্টালজিয়া এবং নতুন কোনো চমকের প্রত্যাশা।
অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম: ইতিহাসের সাক্ষী
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে। ফুটবল ইতিহাসে এই স্টেডিয়ামের গুরুত্ব অসাধারণ। ১৯৭০ এবং ১৯৮৬ সালের পর তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজন করতে যাচ্ছে এই ভেন্যু।
অ্যাজটেকা এমন একটি স্টেডিয়াম, যেখানে বিশ্ব ফুটবলের দুই মহাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ উদযাপন করেছে। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল এখানে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। অন্যদিকে ১৯৮৬ সালে দিয়েগো মারাদোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করে।
ফলে ২০২৬ সালের উদ্বোধনী ম্যাচও এই ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামে নতুন অধ্যায় রচনার অপেক্ষায়।
স্বাগতিক মেক্সিকোর ওপর বাড়তি চাপ
বর্তমানে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের শীর্ষ দলগুলোর মধ্যে থাকা মেক্সিকো নিজেদের মাঠে খেলতে নামছে বড় প্রত্যাশা নিয়ে। ‘এল ত্রি’ নামে পরিচিত দলটি এবার অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রতিভার সমন্বয়ে শক্তিশালী স্কোয়াড গঠন করেছে।
দলের আক্রমণভাগের নেতৃত্বে থাকবেন অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড রাউল হিমেনেজ। তার সঙ্গে আক্রমণে দেখা যাবে এসি মিলানের তারকা সান্তিয়াগো হিমেনেজকে। মিডফিল্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন ওয়েস্ট হ্যামের এদসন আলভারেজ।
বিশেষ নজর থাকবে ১৭ বছর বয়সী উদীয়মান ফুটবলার গিলবার্তো মোরার দিকে। তরুণ এই ফুটবলার বিশ্বকাপের সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
গোলপোস্টের নিচে দায়িত্ব সামলাবেন অভিজ্ঞ গোলরক্ষক গিলেরমো ওচোয়া, যিনি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলের নির্ভরতার প্রতীক।
উচ্চতার সুবিধা কাজে লাগাতে চায় মেক্সিকো
মেক্সিকোর অন্যতম বড় শক্তি হতে পারে তাদের ঘরের পরিবেশ। দলটির বেশিরভাগ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২২০০ মিটার উচ্চতায়। এই পরিবেশে খেলতে অভ্যস্ত হওয়ায় স্বাগতিকরা বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চতার কারণে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতায় কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে, যা মেক্সিকো নিজেদের কৌশলগত সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করতে চাইবে।
চমক দেখাতে প্রস্তুত দক্ষিণ আফ্রিকা
আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম পরিচিত নাম দক্ষিণ আফ্রিকা। ‘বাফানা বাফানা’ নামে পরিচিত দলটি বরাবরই আবেগ, গতি এবং লড়াকু মানসিকতার জন্য প্রশংসিত।
দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ হুগো ব্রুস মূলত ঘরোয়া লিগের খেলোয়াড়দের নিয়েই দল সাজিয়েছেন। দেশের সফল দুই ক্লাব মামেলোডি সানডাউন্স এবং অরল্যান্ডো পাইরেটস থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফুটবলার দলে সুযোগ পেয়েছেন।
অধিনায়ক এবং গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস দলের অন্যতম ভরসা। এছাড়া আক্রমণভাগে বার্নলির স্ট্রাইকার লাইল ফস্টার এবং মিডফিল্ডে তেবোহো মোকোয়েনার পারফরম্যান্সের দিকে বিশেষ নজর থাকবে।
প্রস্তুতিতে কিছু বাধা, তবুও আত্মবিশ্বাসী বাফানা বাফানা
বিশ্বকাপের আগে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রস্তুতিতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে ভিসা জটিলতার কারণে। নির্ধারিত সময়ের তুলনায় দেরিতে মেক্সিকো পৌঁছায় দলটি। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর থেকেই কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে দ্রুত নিজেদের প্রস্তুত করে তুলছে খেলোয়াড়রা।
বিশেষ করে মেক্সিকোর উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে কোচিং স্টাফ আলাদা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
পরিসংখ্যানে এগিয়ে মেক্সিকো
উদ্বোধনী ম্যাচের আগে বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী মেক্সিকোকে পরিষ্কার ফেবারিট ধরা হচ্ছে। তাদের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় ৬৮ শতাংশ বলে ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
মেক্সিকো শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামবে। দ্রুত পাসিং, বলের দখল ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখাই হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য।
অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে খেলতে পারে। তারা প্রতিআক্রমণের সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোলের চেষ্টা করবে। সেই ক্ষেত্রে লাইল ফস্টারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের সূচনা
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুধু অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যার কারণেই নয়, আয়োজনের ব্যাপ্তির কারণেও ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো জুড়ে অনুষ্ঠিত হবে শতাধিক ম্যাচ।
ফিফা এবার তিন আয়োজক দেশেই বিশেষ উদ্বোধনী আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
তবে সব আলো শেষ পর্যন্ত থাকবে অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামের দিকে, যেখানে ১১ জুন মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসব।
এখন প্রশ্ন একটাই—১৬ বছর আগে যে ম্যাচ ড্র হয়েছিল, এবারও কি সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি অ্যাজটেকার গ্যালারিতে জন্ম নেবে নতুন কোনো বিশ্বকাপ গল্প?

