বিশ্বকাপের আরেকটি শক্তিশালী পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে ফ্রান্স। মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা আবারও প্রমাণ করেছে কেন তারা শিরোপার অন্যতম বড় দাবিদার। ম্যাচে একটি পেনাল্টি থেকে গোল করতে না পারলেও শেষ পর্যন্ত দুর্দান্ত এক গোল করে নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন কিলিয়ান এমবাপে। অন্য গোলটি করেন উসমান দেম্বেলে।
এই জয়ের মাধ্যমে দিদিয়ের দেশঁর দল শুধু শেষ চারেই ওঠেনি, বরং পুরো টুর্নামেন্টে নিজেদের আধিপত্যও আরও একবার প্রতিষ্ঠা করেছে। আক্রমণ, বল দখল, গতি এবং রক্ষণ—সব বিভাগেই ফ্রান্স ছিল অনেক বেশি পরিণত ও কার্যকর।
ম্যাচের প্রথমার্ধে ফ্রান্স একটি পেনাল্টি পায়। স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব নেন কিলিয়ান এমবাপে। তবে মরক্কোর গোলরক্ষকের দৃঢ়তায় সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। অনেক ফুটবলার এমন পরিস্থিতিতে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেললেও এমবাপে ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন।
দ্বিতীয়ার্ধে নিজের গতির ঝলক, নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে অসাধারণ একটি গোল করে তিনি দলকে এগিয়ে দেন। সেই গোলই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং ফ্রান্সকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। পুরো ম্যাচে তাঁর উপস্থিতি মরক্কোর রক্ষণকে বারবার চাপে ফেলেছে।
এমবাপের গোলের পর মরক্কো ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও ফ্রান্স তাদের সেই সুযোগ দেয়নি। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ধারাবাহিক আক্রমণ চালাতে থাকে দেশঁর শিষ্যরা।
ম্যাচের শেষদিকে উসমান দেম্বেলে আরেকটি সুন্দর আক্রমণ থেকে গোল করে ব্যবধান ২-০ করেন। তাঁর নিখুঁত ফিনিশিংয়ের ফলে ম্যাচের ফল কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায়। পুরো ম্যাচজুড়েই দেম্বেলের গতি ও ড্রিবলিং মরক্কোর ডিফেন্ডারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ম্যাচের প্রথম বাঁশি থেকেই দুই দল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে। তবে ফ্রান্সের আক্রমণের ধার ছিল অনেক বেশি। মাত্র চার মিনিটের মধ্যেই দায়োত উপামেকানোর শক্তিশালী হেড অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনো।
এরপর একের পর এক আক্রমণে মরক্কোর রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে ফরাসিরা। বল দখল, ছোট ছোট পাস এবং দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকের মাধ্যমে তারা প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধেই আটকে রাখে। যদিও মরক্কো মাঝেমধ্যে পাল্টা আক্রমণ গড়ে তোলে, কিন্তু ফ্রান্সের শক্তিশালী রক্ষণভাগ তাদের খুব বেশি সুযোগ দেয়নি।
হারের পরও মরক্কোকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তারা নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে লড়াই করেছে। গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলের হার আরও বড় হওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন।
মাঝমাঠে বল ধরে রাখার চেষ্টা এবং দ্রুত আক্রমণে ওঠার পরিকল্পনা থাকলেও ফ্রান্সের সংগঠিত রক্ষণ ও অভিজ্ঞতা মরক্কোর পথ কঠিন করে তোলে। শেষ পর্যন্ত সুযোগ তৈরি করেও গোলের দেখা পায়নি আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।
বিশ্বকাপের আগের আসরেও সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ফ্রান্স ও মরক্কো। সেই ম্যাচেও ফরাসিরা ২-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল। এবারও একই ব্যবধানে জয় এল, যদিও গোলদাতাদের তালিকায় এসেছে নতুন নাম।
এবারের ম্যাচে লুকাস হার্নান্দেজ কিংবা রান্ডাল কোলো মুয়ানির পরিবর্তে গোল করেছেন এমবাপে ও দেম্বেলে। এতে স্পষ্ট, ফ্রান্সের আক্রমণভাগে একাধিক ম্যাচজয়ী ফুটবলার রয়েছে। যে কোনো খেলোয়াড়ই বড় ম্যাচে দায়িত্ব নিতে সক্ষম।

ফ্রান্সের প্রধান কোচ দিদিয়ের দেশঁ আবারও কৌশলগত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি এমন একটি দল গড়েছেন, যেখানে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের দারুণ সমন্বয় রয়েছে। রক্ষণে শৃঙ্খলা, মাঝমাঠে ভারসাম্য এবং আক্রমণে গতি—সব মিলিয়ে ফ্রান্সকে সম্পূর্ণ একটি দল হিসেবেই দেখা যাচ্ছে।
দেশঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলোয়াড়রা পুরো ম্যাচে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। প্রতিটি আক্রমণ ছিল পরিকল্পিত এবং রক্ষণে ছিল দুর্দান্ত সমন্বয়। এই কারণেই মরক্কো কার্যকর কোনো প্রত্যাবর্তনের সুযোগ পায়নি।
সেমিফাইনালে ফ্রান্সের সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন প্রতিপক্ষ। সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী স্পেনের মতো দলকে হারাতে হলে একই রকম ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ধরে রাখতে হবে।
তবে বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় ফ্রান্সকে থামানো যে সহজ হবে না, তা বলাই যায়। এমবাপে, দেম্বেলে, উপামেকানো এবং পুরো দলের আত্মবিশ্বাস দেখে মনে হচ্ছে তারা টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের দারুণ সুযোগ তৈরি করেছে।
পেনাল্টি মিস করার পর অনেকেই ভেবেছিলেন এমবাপের রাতটি হয়তো হতাশায় শেষ হবে। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম সেরা এই তারকা আবারও দেখিয়ে দিলেন কেন তিনি বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। একটি ভুলকে পেছনে ফেলে দুর্দান্ত গোল করে তিনি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেন এবং দলের সবচেয়ে বড় ভরসা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ফ্রান্সের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।
মরক্কোর বিপক্ষে ২-০ গোলের এই জয় শুধু একটি সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেনি, বরং ফ্রান্সের শক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং শিরোপা জয়ের মানসিকতাকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। কিলিয়ান এমবাপের অনবদ্য প্রত্যাবর্তন, উসমান দেম্বেলের কার্যকর ফিনিশিং এবং দিদিয়ের দেশঁর নিখুঁত কৌশল মিলিয়ে ফ্রান্স এখন বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদার। যদি তারা একই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে, তবে আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে তাদের দেখা যাওয়া মোটেও বিস্ময়কর হবে না।

