ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উত্তেজনাপূর্ণ কোয়ার্টার ফাইনালে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দিয়েছে ফ্রান্স। শক্তিশালী মরক্কোর বিপক্ষে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে বর্তমান ইউরোপীয় পরাশক্তি। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও উসমান ডেম্বেলের অসাধারণ গোল ফ্রান্সকে জয়ের খুব কাছাকাছি নিয়ে যায়।
শুরুতে কিছুটা সতর্ক ফুটবল খেললেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ছন্দ ফিরে পায় দিদিয়ে দেশমের দল। বলের দখল, দ্রুত পাসিং এবং ধারাবাহিক আক্রমণে মরক্কোর রক্ষণকে চাপে রাখে তারা।
প্রথমার্ধে একটি পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন কিলিয়ান এমবাপ্পে। সেই মুহূর্তে সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা হতাশা তৈরি হলেও ম্যাচের দ্বিতীয় ভাগে নিজের মানের প্রমাণ দেন তিনি।
বক্সের ঠিক বাইরে থেকে নেওয়া নিখুঁত বাঁকানো শটে প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের নাগালের বাইরে বল পাঠিয়ে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন এই তারকা ফরোয়ার্ড। গোলটি ছিল গতি, দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাসের অনন্য সমন্বয়।
এমবাপ্পের এই গোল তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বড় মঞ্চে চাপের মুহূর্তে তিনি আবারও দলের ভরসার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
প্রথম গোলের ধাক্কা সামলানোর আগেই দ্বিতীয়বার জালে বল জড়ায় ফ্রান্স। আক্রমণের সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এমবাপ্পে। তার নিখুঁত পাস থেকে বল পেয়ে দুর্দান্ত গতিতে ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে এগিয়ে যান ব্যালন ডি’অরজয়ী উসমান ডেম্বেলে।
চমৎকার ফিনিশিংয়ে তিনি গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুকে পরাস্ত করে স্কোরলাইন ২-০ করেন। ডেম্বেলের ব্যক্তিগত দক্ষতা এবং বল নিয়ন্ত্রণ দর্শকদের মুগ্ধ করে।
ফ্রান্সের প্রথম গোলের আগে হ্যান্ডবলের অভিযোগ তোলে মরক্কোর খেলোয়াড়রা। তারা রেফারির কাছে তীব্র আপত্তি জানায়। পরে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) পুরো ঘটনাটি পর্যালোচনা করে।
পর্যালোচনার পর রেফারি গোল বহাল রাখেন। ফলে মরক্কোর হতাশা আরও বাড়ে এবং ম্যাচের গতি পুরোপুরি ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
দ্বিতীয় গোলের পর ফ্রান্স আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। মিডফিল্ড থেকে দ্রুত আক্রমণ গড়ে তুলে একের পর এক সুযোগ তৈরি করতে থাকে তারা।
অন্যদিকে মরক্কো আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ফ্রান্সের সংগঠিত রক্ষণভাগ তাদের খুব বেশি সুযোগ দেয়নি। মাঝমাঠেও আধিপত্য ধরে রাখে লে ব্লু।
পিছিয়ে পড়ার পর মরক্কোর কোচ একাধিক পরিবর্তন আনেন। রহিমি ও আমরাবাতকে মাঠে নামিয়ে আক্রমণ এবং মাঝমাঠে নতুন প্রাণ ফেরানোর চেষ্টা করা হয়।
তবে ফ্রান্সের রক্ষণ এতটাই শক্ত অবস্থানে ছিল যে পরিবর্তনের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।
ম্যাচের এক পর্যায়ে এমবাপ্পেকে থামাতে দেরিতে ট্যাকল করে হলুদ কার্ড দেখেন মরক্কোর ডিফেন্ডার ডিওপ। এই কার্ডের কারণে দল সেমিফাইনালে উঠতে পারলে পরের ম্যাচে তার খেলা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু পুরো ম্যাচজুড়েই ব্যস্ত সময় কাটান। কয়েকটি দারুণ সেভ করলেও ডেম্বেলের নিচু শট ঠেকাতে ব্যর্থ হন তিনি। যদিও দুটি গোল হজম করেছেন, তবুও বেশ কয়েকটি নিশ্চিত সুযোগ রুখে দিয়ে বড় ব্যবধানে হার এড়াতে ভূমিকা রাখেন।
এই জয়ের ফলে ফ্রান্স সেমিফাইনালের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়। দলটির আক্রমণভাগ, মাঝমাঠ এবং রক্ষণ—সব বিভাগই ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। বিশেষ করে এমবাপ্পে ও ডেম্বেলের সমন্বয় প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি হয়ে ওঠে।
বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তার যে প্রয়োজন, তা আবারও প্রমাণ করেছে ফরাসি দল।
এই ম্যাচে এমবাপ্পের গোল, ডেম্বেলের একক নৈপুণ্যে করা গোল এবং ফ্রান্সের সংগঠিত দলগত পারফরম্যান্সই ছিল সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। মরক্কো শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেলেও ফ্রান্সের গতি ও দক্ষতার সামনে তারা কার্যকরভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স আবারও দেখিয়ে দিল কেন তারা অন্যতম শিরোপা দাবিদার। এমবাপ্পের নেতৃত্ব, ডেম্বেলের সৃজনশীলতা এবং পুরো দলের শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে মরক্কো সাহসী লড়াই করলেও সুযোগ কাজে লাগাতে না পারায় হতাশা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে। এখন ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষা, সেমিফাইনালে ফ্রান্স একই ছন্দ ধরে রাখতে পারে কি না।

