খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদবার্লিন প্রাইড উৎসবে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: জনতার ভিড়ে গাড়ি উঠে নিহত ১, আহত...

বার্লিন প্রাইড উৎসবে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: জনতার ভিড়ে গাড়ি উঠে নিহত ১, আহত ১৭

বার্লিন প্রাইড উৎসবের এই মর্মান্তিক ঘটনা পুরো জার্মানিকে শোকাহত করেছে। আনন্দ উদযাপনের দিনে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় একজনের প্রাণহানি এবং ১৭ জনের আহত হওয়া জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

জার্মানির রাজধানী বার্লিনে অনুষ্ঠিত বার্ষিক প্রাইড উৎসবের আনন্দঘন পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে রূপ নেয় আতঙ্ক ও শোকে। শনিবার রাতের দিকে একটি গাড়ি উৎসবস্থলের কাছাকাছি জনতার ভিড়ে উঠে গেলে ঘটনাস্থলেই একজনের মৃত্যু হয় এবং অন্তত ১৭ জন আহত হন। ঘটনার পরপরই চালক গাড়ি ফেলে পালিয়ে যায়। তাকে খুঁজে বের করতে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে জার্মান পুলিশ।

এই ঘটনা ঘটে বার্লিনের ঐতিহাসিক ব্রান্ডেনবুর্গ গেট সংলগ্ন টিয়ারগার্টেন এলাকায়, যেখানে ‘ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে’ (সিএসডি) উপলক্ষে কয়েক লাখ মানুষ একত্রিত হয়েছিলেন। ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ এই প্রাইড উৎসব বৈচিত্র্য, সমতা এবং এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে পরিচিত।

ঘটনার পর পুরো এলাকাজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। জরুরি সেবা কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসা শুরু করেন। একই সঙ্গে পুলিশ তদন্ত শুরু করে।

বার্লিন পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত ১০টার কিছু আগে একটি সাদা রঙের গাড়ি টিয়ারগার্টেন এলাকায় প্রবেশ করে। এরপর সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একাধিক পথচারীকে ধাক্কা দিয়ে একটি গাছের সঙ্গে গিয়ে ধাক্কা খায়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে পরিত্যক্ত অবস্থায় গাড়িটি উদ্ধার করলেও চালককে সেখানে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, দুর্ঘটনার পরই তিনি দ্রুত পালিয়ে যান। ফলে পুরো শহরজুড়ে চালককে ধরতে তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে।

তদন্তকারীরা এখনও নিশ্চিত করতে পারেননি ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত ছিল নাকি এটি একটি দুর্ঘটনা। তবে সব ধরনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও নেওয়া হচ্ছে।

জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

আরও পড়ুন :  শেষ মুহূর্তের গোলে পানামাকে হারাল ঘানা : বিশ্বকাপে রুদ্ধশ্বাস লড়াই

মোট ১৭ জন আহতের মধ্যে আটজন গুরুতর আহত হন। তাঁদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। তারা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ঘটনার পরপরই দুর্ঘটনাস্থলের পাশে অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশ সদস্যরা সমন্বিতভাবে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

নিহত ও আহতদের পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পরিচয় গোপন রাখা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ঘটনার আগে পর্যন্ত বার্লিনের ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে উৎসব শান্তিপূর্ণভাবেই চলছিল। জার্মানি ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এই উৎসবে অংশ নিতে এসেছিলেন।

এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো বৈচিত্র্য, সমঅধিকার এবং মানবাধিকারকে উদযাপন করা। ১৯৬৯ সালে নিউইয়র্কের স্টোনওয়াল আন্দোলনের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে প্রতিবছর এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

রঙিন শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট, আলোচনা এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমে মুখর ছিল গোটা শহর। কিন্তু একটি গাড়ির ধাক্কায় মুহূর্তের মধ্যেই উৎসবের পরিবেশ বদলে যায়।

অনেক অংশগ্রহণকারী জানান, তারা হঠাৎ চিৎকার শুনে চারদিকে দৌড়াতে শুরু করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো এলাকা জরুরি সেবা কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে তারা বিকট শব্দ শুনতে পান। এরপর দেখেন কয়েকজন মানুষ রাস্তায় ছিটকে পড়েছেন।

উৎসবে অংশ নেওয়া জুলিয়ান মেথিগ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের জন্য এটি সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনাগুলোর একটি। তিনি বলেন, সমতা ও ভালোবাসার বার্তা ছড়ানোর দিনে এমন ঘটনা কেউ কল্পনাও করেননি।

আরও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই আহতদের প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

দুর্ঘটনার পর বার্লিন পুলিশ দ্রুত এলাকাটি ঘিরে ফেলে। আশপাশের রাস্তা, পার্ক, রেলস্টেশন এবং গণপরিবহন কেন্দ্রগুলোতে তল্লাশি চালানো হয়।

আরও পড়ুন :  ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক জয়! বেলিংহ্যামের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল নিশ্চিত

তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করছেন এবং ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলছেন। এছাড়া যাদের কাছে ছবি, ভিডিও বা অন্য কোনো তথ্য রয়েছে, তাদের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহভাজনের নাম প্রকাশ করা হয়নি। ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও নিশ্চিতভাবে কিছু জানানো হয়নি।

ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে বর্তমানে জার্মানির অন্যতম বৃহৎ নাগরিক আয়োজন।

১৯৭৯ সালে পশ্চিম বার্লিনে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি এখন ইউরোপের অন্যতম বড় প্রাইড উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর কয়েক লাখ মানুষ সমঅধিকার, বৈচিত্র্য এবং বৈষম্যবিরোধী অবস্থান তুলে ধরতে এতে অংশ নেন।

শোভাযাত্রার পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা এবং সামাজিক উদ্যোগও এই উৎসবের অংশ হয়ে উঠেছে।

এবারের ঘটনায় আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা গভীর শোক প্রকাশ করলেও তারা জানিয়েছেন, সহিংসতা তাদের সমতা ও মানবাধিকারের আন্দোলনকে থামাতে পারবে না।

সাম্প্রতিক কয়েক বছরে জার্মানিতে জনসমাগমস্থলে গাড়ি চালিয়ে হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ফলে জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গত মে মাসে লাইপজিগে মানসিক সমস্যায় ভোগা এক চালক পথচারীদের ওপর গাড়ি তুলে দিলে দুজন নিহত এবং তিনজন গুরুতর আহত হন।

এর আগে মানহাইমে আরেকটি ঘটনায় দুইজনের মৃত্যু হয়েছিল। মিউনিখেও একটি শ্রমিক সমাবেশে গাড়ি তুলে দেওয়ার ঘটনায় দুইজন প্রাণ হারান এবং ৪০ জনের বেশি আহত হন, যাদের মধ্যে শিশুও ছিল।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ম্যাগডেবার্গের একটি বড়দিনের বাজারে গাড়ি চালিয়ে হামলার ঘটনায়ও একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। এসব ঘটনার পর থেকে বড় জনসমাগমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদারের দাবি উঠেছে।

আরও পড়ুন :  ফাইনাল শেষে রণক্ষেত্র! পারেদেসের ঘুষি, লাল কার্ড ও বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্ত

বার্লিনের এই ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে কাজ করছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও গোয়েন্দারা। উদ্ধার হওয়া গাড়িটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

পুলিশ জানিয়েছে, এটি দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হামলা—তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ঘটনার পর জার্মানিসহ আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, মানবাধিকার সংগঠন এবং এলজিবিটিকিউ+ সংগঠন নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।

তাদের মতে, প্রাইড উৎসব মানুষের স্বাধীনতা, সমতা এবং বৈচিত্র্য উদযাপনের একটি নিরাপদ মঞ্চ হওয়া উচিত। তাই ভবিষ্যতে এমন অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা জরুরি।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বড় জনসমাগমে প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ, ব্যারিকেড বৃদ্ধি এবং নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো হতে পারে।

বার্লিন প্রাইড উৎসবের এই মর্মান্তিক ঘটনা পুরো জার্মানিকে শোকাহত করেছে। আনন্দ উদযাপনের দিনে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় একজনের প্রাণহানি এবং ১৭ জনের আহত হওয়া জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

পুলিশ চালককে খুঁজে বের করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তদন্তকারীরা ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে কাজ করছেন।

এই ট্র্যাজেডি আবারও মনে করিয়ে দিল, বড় জনসমাগমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সহিংসতার মুখেও তারা সমতা, মানবাধিকার এবং বৈচিত্র্যের পক্ষে তাদের অবস্থান থেকে সরে আসবেন না।

সূত্র: রয়টার্স।