দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ পুলিশ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি। তবে আগের তুলনায় মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যক্রম ও অভিযান অনেকটাই বেড়েছে। প্রকাশ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের তৎপরতা দেখা গেলেও নতুন করে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুলিশের ওপর হামলা, অভিযানে বাধা এবং আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই সদস্যদের ওপর ২৭১টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ছিল ৮৭০টি। ফলে মাঠপর্যায়ে পুলিশের নিরাপত্তা ও সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের কাঠামো ও নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল হয়। অনেক কর্মকর্তা চাকরি হারান, আবার কারও বিরুদ্ধে মামলা ও বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশি স্থাপনা ও যানবাহন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত থানা ও ফাঁড়িগুলো সংস্কার করে আবার কার্যক্রম শুরু করা হয়। মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা নতুন করে অভিযান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু অবকাঠামো সংস্কারের পাশাপাশি পুলিশের মনোবল ও পেশাগত সক্ষমতার জায়গায় এখনো কিছু দুর্বলতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পুলিশে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের জন্য কমিশন গঠনের আলোচনা হলেও সেটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। পুলিশ সপ্তাহসহ বিভিন্ন সময়ে বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরেছেন। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার মধ্যে তদবিরকে অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা। সম্প্রতি রাজারবাগে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এ বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, অনেক পুলিশ সদস্য গত ১৭ বছর ধরে বঞ্চিত ছিলেন বলে দাবি করছেন এবং বর্তমানে বিভিন্ন দপ্তরে তদবিরের জন্য ছুটছেন। তবে তদবিরের মাধ্যমে ভালো পোস্টিং নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
আইজিপি পুলিশ সদস্যদের মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার মাধ্যমে নিজেদের প্রমাণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি অনৈতিক লেনদেন থেকে দূরে থাকার নির্দেশনাও দিয়েছেন।
পুলিশের অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যক্রম শক্তিশালী করতে শুধু অবকাঠামো নয়, কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাও গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে প্রকাশ্যে হামলা। আগে অনেক ক্ষেত্রে নির্জন এলাকা, রাতের অন্ধকার কিংবা অভিযান শেষে ফেরার পথে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটত। এখন পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে।
মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, আসামি ধরতে গেলে পুলিশকে ঘিরে ফেলা, অভিযানে বাধা দেওয়া, গাড়ি ভাঙচুর, মারধর, ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত এবং গুলি চালানোর মতো ঘটনাও ঘটছে। কোথাও কোথাও স্থানীয় জনতা সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশের কাছ থেকে আটক ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
এ ধরনের ঘটনা শুধু পুলিশের ওপর সরাসরি হামলা নয়, বরং আইন প্রয়োগের ক্ষমতাকেও চ্যালেঞ্জ করছে। বিশেষ করে ‘মব’ তৈরি করে নিজেরাই বিচার করার প্রবণতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪৬০টি পুলিশি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৫৮টি থানা ও ২৬টি ফাঁড়িসহ মোট ২২৪টি স্থানে আগুন দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ৫৬টি থানা ও ২৪টি ফাঁড়িসহ ২৩৬টি পুলিশি স্থাপনায় ভাঙচুর করা হয়। হামলার সময় বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদও লুট হয়।
তথ্য অনুযায়ী, ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮টি গুলি লুট হয়েছিল। এর মধ্যে এক হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত থানা ও ফাঁড়িগুলো মেরামত করে পুলিশ আবার কাজ শুরু করেছে। তবে অবকাঠামো পুনর্গঠনের পরও যানবাহনের সংকট পুলিশের দৈনন্দিন কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের ওপর হামলার পাশাপাশি আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো অপরাধীকে আটক করার পর স্থানীয় লোকজন বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি অংশ সংঘবদ্ধ হয়ে বাধা দিচ্ছে।
সম্প্রতি রাজধানীর আদাবরে ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে অভিযানে গিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও একজন এসআই হামলায় আহত হন।
একই দিনে লালমনিরহাটের আদিতমারীতে শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আটক দুজনকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়। স্থানীয়দের হামলায় এনডিসি, পুলিশ সদস্যসহ ৩০ থেকে ৩৫ জন আহত হন। এ সময় সরকারি ছয়টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়।
এর আগে কুমিল্লার বুড়িচংয়ে মহাসড়কে নিষিদ্ধ তিন চাকার যানবাহন আটককে কেন্দ্র করে হাইওয়ে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর এবং পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনাও ঘটে।
এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, আইন প্রয়োগের সময় পুলিশকে শুধু অপরাধীদের নয়, অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের একটি অংশের প্রতিরোধেরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হকের মতে, সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে পুলিশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে।
তার মতে, পুলিশের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন এলেও নতুন নেতৃত্বের অনেকের মাঠপর্যায়ের মূলধারার পুলিশিংয়ের অভিজ্ঞতা পর্যাপ্ত নয়। এর সঙ্গে আস্থার সংকট এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা যুক্ত হওয়ায় শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশ অনেক সময় মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নতুন নতুন অপরাধী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
হামলার ঘটনা শুধু পুলিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। র্যাব, কোস্ট গার্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও বিভিন্ন অভিযানে হামলার শিকার হচ্ছেন।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলায় র্যাব-৭-এর উপ-সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারায় যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় ডাকাতদের হামলায় সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তানজিম ছরোয়ার নিহত হন।
এ ধরনের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য মাঠপর্যায়ের ঝুঁকি কতটা বেড়েছে, তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। সামান্য কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করেও অনেকে সংঘবদ্ধ হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজে বাধা দিচ্ছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, আগের তুলনায় পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। পুলিশ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং সরকারও এ বিষয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তবে পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখনো দ্বিধা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের ওপর হামলা বন্ধ করতে হলে শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা, পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মাঠপর্যায়ের সদস্যদের পেশাগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ৪৪ জন সদস্য নিহত হন। এরপর বাহিনীর ভেতরে যে বড় ধরনের ধাক্কা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে পুলিশকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬০০টি ঘটনায় পুলিশ সদস্যরা হামলার শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালেও ৬০১টি ঘটনায় পুলিশ আক্রান্ত হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের কাজের গতি বাড়লেও তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ কমেনি। একদিকে অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অন্যদিকে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার দুই কাজই একসঙ্গে করতে হচ্ছে।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

