ভারতের মুম্বাইয়ে ট্রেনের সংরক্ষিত কামরায় আসন নিয়ে বিরোধের জেরে রেল সুরক্ষা বাহিনীর (আরপিএফ) সদস্যদের সঙ্গে উত্তেজনায় জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে মডেল-অভিনেত্রী অন্তরা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর তাকে গ্রেপ্তার করেছে রেল পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, ট্রেনের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সংরক্ষিত কামরায় উঠে আসন নিয়ে বচসার একপর্যায়ে অন্তরা পোশাক খুলে ফেলেন এবং হাতে ব্লেড নিয়ে আরপিএফ সদস্যদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার ও এই সময়ের প্রতিবেদনে ঘটনাটির বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুটিংয়ের কাজে সুরাট যাচ্ছিলেন অন্তরা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার কাছে ছিল স্লিপার শ্রেণির টিকিট। তবে অভিযোগ, ওই টিকিট থাকা সত্ত্বেও তিনি অরাবলি এক্সপ্রেসের সংরক্ষিত এসি কামরায় উঠে পড়েন।
ঘটনাটি ঘটে গত ১২ আগস্ট রাতে। বোরিবলি ও ডহানুর মধ্যবর্তী রেলপথে রাত সাড়ে ৯টা থেকে রাত ১০টা ৫০ মিনিটের মধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে এফআইআরে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, ট্রেনের সংরক্ষিত আসনে বসে ছিলেন অন্তরা। তার কাছে ওই শ্রেণির টিকিট না থাকায় এক যাত্রী তাকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি আসন ছাড়তে রাজি হননি বলে অভিযোগ।
বিষয়টি পরে রেল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। খবর পেয়ে রেল সুরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এর পরই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে পুলিশের দাবি।
এফআইআরে বলা হয়েছে, আরপিএফের সহকারী উপপরিদর্শক যামিনীকান্ত মিশ্র এবং কনস্টেবল রাজেশ কুমার ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তারা যাত্রীদের মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেন।
পুলিশের অভিযোগ, অন্তরা ওই দুই কর্মকর্তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং তাদের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে কথাকাটাকাটি আরও বেড়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে আরপিএফ সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নেন।
এরপরই ঘটে আরও অস্বাভাবিক ঘটনা।
পুলিশের দাবি, উত্তেজিত অবস্থায় অন্তরা নিজের পোশাক খুলে ফেলেন। এরপর তিনি একটি রেজর ব্লেড হাতে নিয়ে আরপিএফ সদস্যদের ভয় দেখাতে শুরু করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এফআইআরে আরও দাবি করা হয়েছে, ওই ব্লেড দিয়ে একজন আরপিএফ কর্মীকে আঘাত করার চেষ্টা করেন তিনি। ঘটনায় অন্তরাও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে পুরো ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি কী ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে আরও পরিষ্কার হবে।
রেল পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি যাতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ না করে, সে জন্য ট্রেনের ওই কামরার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে অন্য যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযুক্ত নারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়।
পুলিশের অভিযোগ, কামরার ভেতরে আটকে থাকার পর অন্তরা বের হওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি জানালার কাচ ভাঙারও চেষ্টা করেন বলে এফআইআরে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রেনটি ডহানু স্টেশনে পৌঁছালে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য রেল পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে সেখানে ট্রেন থামলে অন্তরাকে কামরা থেকে নামিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর তাকে গ্রেপ্তার করে রেল পুলিশ। এরপর পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।
রেল পুলিশের নথি অনুযায়ী, অন্তরার বিরুদ্ধে শুধু আরপিএফ সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগই নয়, সরকারি কর্মীদের কাজে বাধা দেওয়া, হামলা এবং ভাঙচুরের মতো একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে।
এফআইআরে যামিনীকান্ত মিশ্র অভিযোগ করেছেন, অন্তরা তার পোশাক ও মোবাইল ফোনও ক্ষতিগ্রস্ত করেন। পুলিশ এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে।
তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, ট্রেনে ওঠার পর ঠিক কী কারণে পরিস্থিতি এত দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। পাশাপাশি সংরক্ষিত কামরায় তার ওঠা, আসন নিয়ে বিরোধ, আরপিএফ সদস্যদের সঙ্গে বচসা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তরা বন্দ্যোপাধ্যায় পেশায় মডেল ও অভিনেত্রী। শুটিংয়ের কাজে সুরাটের উদ্দেশে যাত্রা করছিলেন তিনি।
তবে স্লিপার শ্রেণির টিকিট থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি সংরক্ষিত এসি কামরায় উঠেছিলেন, সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রেল পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ট্রেনের সংরক্ষিত কামরায় নির্দিষ্ট শ্রেণির টিকিট ছাড়া যাত্রা করা নিয়ে অনেক সময় যাত্রীদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। কিন্তু এই ঘটনায় অভিযোগের ধরন তুলনামূলকভাবে গুরুতর হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বর্তমানে পুলিশের তদন্তাধীন। ফলে অভিযোগের প্রতিটি বিষয় আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
রেল পুলিশ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, সংশ্লিষ্ট আরপিএফ সদস্য এবং অন্যান্য যাত্রীর বক্তব্য সংগ্রহ করতে পারে। পাশাপাশি ট্রেনের ভেতরে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ থাকলে সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই ঘটনায় একদিকে যেমন ট্রেনের সংরক্ষিত আসন নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে, অন্যদিকে রেলকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত শেষে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কে কীভাবে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলেছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
অন্তরা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার আইনি প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এখন তদন্তের ফল এবং আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

